লেখা-লেখি

ব্লগ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

জন্মদিনে লহো প্রণাম হে বিপ্লবী কবি






















নজরুল সাহিত্যে পর্তুগিজ ও স্প্যানিস ভাষায় অনুুবাদ
— সুনীতি দেবনাথ

দুই বাংলার প্রাণের কবি কাজী নজরুলের মহাপ্রয়াণের পর তাঁকে, তাঁর সাহিত্যকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেবার একটা প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। আর এই কাজে নজরুল সাহিত্যের অনুবাদ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে অনেকেই মনে করেন। নজরুল দৌহিত্রী খিলখিল কাজী ও অনিন্দিতা কাজীর এ বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগের কথা আমাদের আশান্বিত করে। তেমনি নজরুল পরিবারের বাইরে বহির্বিশ্বে নজরুল প্রেমীদের উদ্যোগও আমাদের উৎসাহিত করে।
  বৈভবময় সৃষ্টির আলোয় আলোকিত  কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম। প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের এই কবির নির্বাচিত কিছু সৃষ্টিকর্ম এবার অনূদিত হলো পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ভাষায়। ফলে এখন থেকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য এই দুই ভাষার পাঠকরাও সুযোগ পেলেন এই কবির কালজয়ী গান, কবিতা বা গদ্যের স্বাদ আস্বাদনের।
    বাংলাদেশের  জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নির্বাচিত সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ভাষায়। পর্তুগিজ ভাষায় বইটির নাম নজরুল: প্রোজাই পোয়েসিয়া সিলেসোনাডোস। অনুবাদ করেছেন পর্তুগালের লেখিকা ওনা হিটা বাপটিসস্টা হোদরিগেজো সিনতো। এতে নজরুলের বিদ্রোহী, ধূমকেতুসহ মোট ৭৮টি কবিতা, গান ও প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
অন্যদিকে স্প্যানিশ ভাষায় নজরুল: প্রোসা ই পোয়েমাস সিলেকতোস বইটি অনুবাদ করেছেন ইকুয়েডরের লেখিকা, গবেষক ও সাংবাদিক মারিয়া এলেনা বাররেরা আগরওয়াল। এতে স্থান পেয়েছে নজরুলের বিদ্রোহী, ধূমকেতুসহ দেড় শ কবিতা, গদ্য ও গান।
   অনুবাদের পরপর ঢাকার  নজরুল ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নজরুল ইনস্টিটিউটের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিশেষ অতিথি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, ঢাকার ব্রাজিল দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন হুলিয়া সিসার সিলভা এবং স্পেন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স প্যাত্রিক স্যান্ডোভাল নিকোলস। স্বাগত বক্তব্য রাখেন  ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইকরাম আহমেদ।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি। অন্যায়-অবিচারকে রুখে দিয়ে কীভাবে শির উঁচু করে অগ্রসর হতে হয়, তিনি আমাদের শিখিয়েছেন।’ তিনি বলেন, জাতীয় কবির নির্বাচিত সাহিত্যকর্ম পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে নজরুল ও তাঁর সৃষ্টিকর্মকে পৃথিবীব্যাপী তুলে ধরা সম্ভব হবে।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিমধ্যে ইংরেজি, উর্দু, ফরাসি, ইতালিয়ান, চীনা ও জাপানি ভাষায় নজরুলের নির্বাচিত সাহিত্য অনূদিত হয়েছে। আজ আরও নতুন দুটি ভাষায় অনূদিত হলো। এখন আরবি ভাষায় নজরুলসাহিত্য অনুবাদের চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় কবির সাহিত্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
    আলোচনার পর নজরুলের বিদ্রোহী ও ধূমকেতু কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন শাহাদাত হোসেন নিপু। এ ছাড়া পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ভাষায়ও কবিতা দুটি আবৃত্তি করা হয়। অনুষ্ঠানে নজরুলের গান গেয়ে শোনান ফেরদৌস আরা ও ইয়াকুব আলী খান।

কাজরী,
২৫ মে, ২০১৮

প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং














           

            ©সুনীতি দেবনাথ

দীর্ঘদিন যাবৎ মোটর নিউরন ডিজিজের সাথে লড়াই করে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত এবং সুপরিচিত একজন বিজ্ঞানীতে পরিণত হওয়া স্টিভেন হকিং ৭৬ বছর বয়সে মারা গেছেন।তিনি  একজন সুরসিক এবং রসবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।  বিজ্ঞানের একজন জনপ্রিয় দূত  তিনি সব সময় নিশ্চিত করতেন যেন তাঁর কাজ সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারেন।
তাঁর লেখা বই 'এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম' অনেকটা ধারণার বাইরে বেস্ট সেলার বা সবচেয়ে বিক্রিত বইয়ে পরিণত হয়।যদিও পরিষ্কার বলা যায় না কতজন পাঠক এই বইয়ের শেষ পর্যন্ত পড়তে পেরেছেন।   ‘জীবন যদি মজার না হতো এটি হতো দুঃখভরা’—এ কথাগুলো বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ধারণ করেছিলেন। ১৪ মার্চ তিনি ৭৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর দুর্দান্ত রসবোধ, এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণী ও ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বরে দৃঢ় বিশ্বাসের কথা মানুষ দীর্ঘদিন মনে রাখবে। বিশ্বখ্যাত তত্ত্বগুলো আবিষ্কারের পাশাপাশি তাঁর জীবনের কিছু অন্য দিকও আছে।
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুর ৩০০ বছর পূর্তির দিন জন্ম নেন স্টিফেন হকিং। মারা গেলেন আরেক বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ১৩৯তম জন্মদিনে। ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আইনস্টাইন। স্টিফেন হকিং - এর এ যেন কাকতালীয় ঘটনা।

আইনস্টাইন বলতেন, যে তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি বা আইকিউ নিয়ে গর্ব করে সে হারার দলে। আবার  স্টিফেন হকিং নিজেকে মেধাবী মনে করতেন না। তিনি ছিলেন কুড়েদের দলে।
স্কুলজীবনে খুব ভালো গ্রেড পাননি। তিনি ছিলেন গড়পড়তা দলের। তবে স্কুলের বাঁধাধরা লেখাপড়ার বাইরে অন্য কিছু শেখার ব্যাপক ঝোঁক ছিল। ক্লাসে তো রীতিমতো ‘আইনস্টাইন’ খেতাব পেয়েছিলেন তিনি।
যখন জটিল তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতেন না, তখন হকিং শিশুতোষ বই লিখতেন। মেয়ের সঙ্গে চার খণ্ডের একটি বই লিখেছেন তিনি। ২০০৭ সালে লেখা ‘জর্জ’স সিক্রেট কি টু দ্য ইউনিভার্স’ বইটি প্রকাশের পর ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালে এর আরও সিক্যুয়েল বের হয়। এসব বইয়ে সহজ ভাষায় অণু-পরমাণু, গ্রহ-নক্ষত্র, ব্ল্যাকহোলের বিষয়ে বর্ণনা করেছেন তিনি।

স্টিফেন হকিং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিকে ছিলেন অনেক বেশি নিঃসঙ্গ। তাই হয়তো একাকিত্ব দূর করতেই যোগ দিয়েছিলেন কলেজের বোট রেসিং টিমে। সবচেয়ে মজার কথাটি হলো, তাঁর দায়িত্ব ছিল রেসের সময় নৌকার হাল ধরে রাখা এবং এই কাজ তিনি এত সফলতার সঙ্গে করেছিলেন যে অল্প কিছু দিনেই হয়ে উঠেছিলেন পুরো অক্সফোর্ডে বিপুল জনপ্রিয়। সপ্তাহে ছয় দিন সন্ধ্যায় অনুশীলন করতে হতো বোট চালানোর।
২০১২ সালে পদার্থবিজ্ঞানীরা ঘোষণা দিলেন যে তাঁরা হিগস-বোসন কণা বা ঈশ্বর কণার দেখা পেয়েছেন। এতে বেশ অখুশি ছিলেন হকিং।  কারণ, বাজিতে হেরে যান হকিং। হকিং তাঁর বন্ধুর সঙ্গে ১০০ ডলারের বাজি ধরে বলেছিলেন, কখনো ঈশ্বর কণার খোঁজ পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাজিতে তিনি হেরে যান। এর আগেও ১৯৯৭ সালে তিনি মার্কিন বিজ্ঞানী জন প্রিস্কিলের সঙ্গে বাজি ধরেন। তাঁর কথা ছিল, কৃষ্ণগহ্বর থেকে কিছু বের হতে পারে না। কিন্তু ২০০৪ সালে পরাজয় মেনে নেন তিনি।
  বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে ডাক্তারি পড়বে, নয়তো অক্সফোর্ডে পড়বে অথচ টাকা ছিল না। স্টিফেন হকিং তাই অংশগ্রহণ করলেন স্কলারশিপ পরীক্ষায় এবং সফলতার স্বাক্ষর রেখে টিকেও গেলেন।

কসমোলজি ছিলো  তাঁর প্রিয় বিষয়।
ছোটবেলা থেকে প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল গণিতে, অথচ অক্সফোর্ডে এসে বেছে নিলেন ফিজিকসের একটি অপ্রচলিত শাখা কসমোলজি।
ভারশূন্যতায় থাকার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল।২০০৭ সালে ৬৫ বছর বয়সে রিচার্ড ব্র্যানসনের সাহায্যে ভারশূন্য অভিজ্ঞতা নিতে মহাকাশ ভ্রমণ করেন হকিং। মহাকাশে ভাসতে ভাসতে তিনি চেয়ার ছেড়ে দেন এবং পা ছোড়ার চেষ্টা করেন। সেই বিশ্বের জনপ্রিয় বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ইহলোকে আর নেই। তাঁর প্রয়ানে শোকস্তব্ধ দুুুনিয়া। এমন বিজ্ঞানী পৃৃথিবীতে আর নেই। পরম শ্রদ্ধা জানাচ্ছি তাঁকে প্রয়ানদিবসেে।

 ( সহায়তা : ইন্টারনেট)

কাজরী,
১৪ মার্চ, ২০১৮





একুশের প্রথম কবিতাটি লেখেন মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী। কবিতাটির নাম ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। তখন তিনি প্রগতিশীল মাসিক সীমান্তর সম্পাদক এবং চট্টগ্রামের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৭ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকায় ছাপা হয় ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। বইটির দাম রাখা হয় দুই আনা। ওই দিনই চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় রাজনৈতিক কর্মী হারুনূর রশীদ কবিতাটি পাঠ করে শোনান। কবিতাটি ছাপানোর সময় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার কোহিনূর প্রেসে হামলা চালায় পুলিশ। কিন্তু প্রেসের কর্মীরা আগেভাগেই পাণ্ডুলিপি, সাজানো ম্যাটার ও মুদ্রিত কপি গোপন করে ফেলতে সক্ষম হন। পুলিশ চলে গেলে আবার নতুন করে শুরু হয় ছাপার কাজ। প্রকাশের পর কবিতাটি বাজেয়াপ্ত করে সরকার, কবির বিরুদ্ধে জারি করে হুলিয়া। আর এটি ছাপার অপরাধে কোহিনূর প্রেসের ম্যানেজার দবির আহমেদ চৌধুরী ও প্রথম পাঠক চৌধুরী হারুনূর রশীদকে দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়।
    সেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ কবিতাটি আজ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে উদ্ধার করছি। সেই সাথে একুশের ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে!

কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি
-------------------------------------------------------
মাহবুব উল আলম চৌধুরী

ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে—রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য—বাংলার জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।”
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।

আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে
নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো
হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোনো
সরকারি চাকুরে।
তোমারই আমারই মতো
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে
পারতো,
আমারই মতো তাদের কোনো একজনের
হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য হয়ে গিয়েছিল,
তোমারই মতো তাদের কোনো একজন হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল।
এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল
সেই সব মৃতদের নামে
আমি ফাঁসি দাবি করছি।

যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে
আমি ফাঁসি দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবি করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।

পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন,
দেশের চল্লিশ জন সেরা ছেলে
মা, বাবা, নতুন বৌ, আর ছেলে মেয়ে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কী ভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার,

যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোনো পদক্ষেপ।

যদিও অগণন অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে।
যদিও ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবু তোমাদের শহীদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।

খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত
কোনো দিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে,
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
ন্যায়-নীতির দিন
হে আমার মৃত ভাইরা,
সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে
ভেসে আসবে
সেই দিন আমার দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।

চট্টগ্রাম, ১৯৫২

[ পরবর্তীকালে নানা পরিপ্রেক্ষিতে কবিতাটির কিছু কিছু পরিবর্তন হয়।  ]

কিছু কথা


কিছু কথা
--------------
© সুনীতি দেবনাথ

একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে। আমার শিক্ষার্থী জীবনে জন্মের পরে মা বাবাকে আত্মার শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি । প্রথাগত জীবনে এতো বেশি সংখ্যক সুশিক্ষক পেয়েছি যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম পেয়েছে কিনা সন্দেহ। সন্দেহ এজন্যই অনেকের আলোচনা থেকে বুঝতে  পারছি। ওসব থাক, আমি আদর্শ শিক্ষক হিসেবে যাদের পেয়েছি, তাঁদের সামান্য কজনের নাম এখানে তুলে ধরতে চাই। প্রথমেই বলি আমার প্রিয় শিক্ষিকা সুজাতা মহাপাত্রের কথা। দিদিমণি আগরতলায় আছেন। আমার জীবনের দিগ্ দর্শন করিয়েছেন তিনি। কয়েকদিন আগে ফোনে কথা হলো। তিনি খুশি হয়েছেন। নিক্তি নিয়ে মাপছি না, মনের অনুভূতি দিয়ে অনুভব করে বলছি। আরো কিছু নাম উল্লেখ করবো, তাঁদের কেউ আছেন, কেউ নেই। আমার স্কুলের প্রতিষ্ঠাত্রী বনলতা দেবী, সবার গুরুমা। ইতিহাস!!! অঞ্জলি মুখার্জি, মায়ের মত। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। হরনাথ নাগ, সবিতা রায়। স্কুল জীবনে আরো স্মরণীয় ড.রমণী মোহন শর্মা। সরোজ. চক্রবর্তী, অজয় ভূষণ চক্রবর্তী, বিভা দাশ, রেবা দাশ এবং আরো অনেকে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়েছি রত্ন সদৃশ শিক্ষকদের। ড. জলদবরণ গাঙ্গুলি, অচিন্ত্যকুমার রায়, ধীরাজ চৌধুরী, বিজন চৌধুরী,  দিনেশ দাশ,  ড. রণেন্দ্র নাথ দেব, রমেন্দ্র বর্মন, চিরঞ্জীব কবিরাজ এবং আরো  অনেকে। একটা কথা  এঁরা ধমক দিয়েছেন, গোপনে স্নেহ করেছেন। সবাই আজ নেই.। অল্প সংখ্যায় আছেন। আজ আমি যা, তাঁদের কল্যাণে। শিক্ষকের বিচার ক্ষমতা আমার নেই। চিরঋণী তাঁদের কাছে । ঔদ্ধত্য নয় নম্রতা ও শ্রদ্ধা নিয়ে আজ প্রণাম তাঁদের।

বিশ্বের প্রথম ভাষা শহীদ নারী : কমলা ভট্টাচার্য্য























© সুনীতি দেবনাথ

মাতৃভাষা বাংলার জন্য প্রথম নারী শহীদ হবার কাহিনীর সৃষ্টিকারিণী বিশ্বে ষোল বছরের নারী কমলা ভট্টাচার্য্যের নাম সমগ্র বিশ্ব  ইতিহাসে সোনার আখরে লেখা থাকবে।  নিদারুণ বেদনার্ত কাহিনীর বীরাঙ্গনা নায়িকা চিরদিনই শিলচরবাসীর মনে যেমন, তেমনি মাতৃভাষাপ্রেমী সকল মানুষের মনে জাগ্রত থাকবেন। ১৯৬১সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী বর্ষে উনিশে মে অসমের কাছাড় জেলার সদর শিলচর শহরের রেলস্টেশনে বাংলা  ভাষার সরকারী স্বীকৃতি দাবীর আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এগার জন। সেই এগারোজন শহীদের একজন এবং একমাত্র নারী কমলা। কমলা ভট্টাচার্য্য ভাষার জন্য শহীদ পৃথিবীর প্রথম  নারী।  তথ্যটি পশ্চিমবাংলার বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী বিশেষ করে শিল্প সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত মানুষদের অজানা। কিছুসংখ্যক যাঁরা জানেন তাঁরাও না জানার ভান করেন বা এড়িয়ে যান। তাই ভিয়েতনাম, লাতিন আমেরিকা, প্যালেস্তাইন,সিরিয়ার জন্য পাতা ভরানো বাঙালী কবির কলমে  মনীষ ঘটক বনফুলের মত দু' চারজন বাদে শিলচরের ঘটনা স্থান পায় নি। পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন গবেষণাপত্র লেখা হয় নি। কলকাতায় ২১শে স্মরণে বেদী আছে কিন্তু ১৯শে সম্পর্কে লক্ষণীয়ভাবে  ঔদাসীন্য দেখি । আর বাংলাদেশে এমন উদাসীনতা বা অনুল্লেখ থাকাটা বিচিত্র বিষয় হতে পারে না।
   
 ১৮৭৪ সালে বাংলাভাষী শ্রীহট্ট জেলা অসম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। অসমে এক সময় সরকারী ভাষা ছিল বাংলা। পরে অসমীয়া ভাষা প্রধান সরকারী ভাষা ঘোষিত হলেও সমগ্র অসমে বাংলা চালু ছিল সরকারী স্তরে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় এক বিতর্কিত গণভোটে শ্রীহট্ট জেলাকে অসম থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়, শুধু কাছাড় অংশ ভারতে থেকে যায় অসমের একটি জেলা হিসেবে। একশ শতাংশ বাংলাভাষী কাছাড় জেলায় বাংলাই ছিল প্রধান সরকারী ভাষা। ১৯৬০ সালে অসম সরকার অসমীয়াকে একমাত্র সরকারী ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার বিরুদ্ধে বাংলা ও অনান্য স্থানীয় ভাষার স্বীকৃতির দাবীতে কাছাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক প্রবল ভাষা আন্দোলন।

  প্রতিক্রিয়ায় অসমীয়া গরিষ্ঠ অঞ্চলে বাঙালীদের ওপর নেমে আসে প্রচণ্ড অত্যাচার। অসমের বাংলাভাষী মুসলমানেরা তাদের মাতৃভাষা অসমীয়া ঘোষণা না করলে তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হবে এই ভয় দেখানো হয়।   ২০১১ সালের সেন্সাসে বাংলাভাষী মুসলমানরা যাতে তাঁদের মাতৃভাষা অসমীয়া ঘোষণা করেন তারজন্য সম্মেলনও হচ্ছিলো এবং অসমের বাংলাভাষী মুসলমানরা এই ব্যাপারে বর্তমানে কিছুটা দ্বিধা বিভক্ত।এই বিষয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।  এটা বাংলাভাষার আন্দোলন নয় বাঙালী হিন্দুর মুসলিম বিরোধী কার্য্যকলাপ বলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো হয়। দাঙ্গা, দমন পীড়নকে অগ্রাহ্য করে বাংলাভাষার দাবীতে রাস্তায় নামেন কাছাড় জেলার সর্বস্তরের মানুষ।

১৯৬১র ১৪ই এপ্রিল (১লা বৈশাখ)পালিত হয় সংকল্প দিবস। ১৯শে এপ্রিল থেকে পদযাত্রা শুরু হয় সারা জেলা জুড়ে। ১৮ই এপ্রিল ছাত্র সমাবেশ, বিশাল মশাল মিছিল হল করিমগঞ্জে, শিলচরে।  ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনের মত এখানেও ছাত্ররা সামনের সারিতে। পরে ১৯শে মে, পালিত হবে অসহযোগ দিবস, স্তব্ধ হবে সারা রাজ্য বাংলা ভাষার জন্য।

    শ্রীহট্ট নন্দিনী কমলা ভট্টাচার্য্যের পিতা ছিলেন রামরমণ ভট্টাচার্য্য ও মাতা সুপ্রভাসিনী দেবী। দেশ ভাগের শিকার  কমলাদের পরিবার শ্রীহট্ট থেকে কাছাড়ে আসে ১৯৫০ সালে। পিতা মৃত। অভাবের পরিবারে দুবেলা পেটভরা অন্ন জুটতো না। চার বোন, কমলা তৃতীয়। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৪৫ সালে।  তিন ভাই – দু'জন কমলার বড়, বকুল ছোট। দ্বিতীয় বোন (সেজদি) প্রতিভা এক স্কুলের শিক্ষিকা, তাঁর আয়ে কোনমতে সংসার চলে। পড়ার ব্যয় নির্বাহের পথ ছিলো না। তবু জেদ ছিলো কমলার তিনি  গ্র্যাজুয়েট হবেনই।  সেই জেদ থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসা, টাইপ রাইটিং শেখার উদ্যোগ নেওয়া  —আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেই।
 
 ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ। পরদিনই পিকেটিংএ যাবার জন্য তৈরি কমলা। এ এক বিশেষ দিন, এই পিকেটিং সারা কাছাড়  স্তব্ধ করে দেবে ভাষার জন্য। বাঙালী সব কিছু করতে পারে। কমলাকে যেতে বাধা দেন মা সুপ্রভাসিনী। কমলা তা মানেননি। সেজদির স্কুলে যাবার জন্য কেঁচে ধুয়ে রাখা কাপড়টা পরে প্রস্তুত কমলা। দলবল এলো বলে। ২০-২২ জন মেয়ের একটা দল এসেছে বাড়িতে, কমলাকে ডাকতে। এবার সেজদিও মানা করে।ওরা বলে কিছু হবে না,  ওরা থাকবে রেলস্টেশনে। সকালের ট্রেন আটকে দিলে সারা দিন সব বন্ধ। পায়ে পায়ে বেরিয়ে আসে কমলা। ইতিমধ্যে ছোটবোন মঙ্গলাও সাথ নিয়েছে। 'চল, তুইও চল। কিছু খেয়ে গেলে হত না?' মার মুখ দেখে বুঝলেন ঘরে কিছু নেই। খাবার দিতে না পারলেও মা কমলাকে একটা বড় কাপড়ের টুকরো দিয়ে দিলেন। 'সাথে রাখিস, কাঁদানে গ্যাস ট্যাস ছোড়ে যদি'।কমলার সাথে বেরিয়ে পড়ে কমলার ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল, ও বড়দির ছেলে বাপ্পা। দুপুরবেলা কমলার মা দুশ্চিন্তা করতে করতে স্টেশনে গেলেন   । যাবার পথে একটা পুলিশের গাড়ি তাঁকে ধূলি ধুসরিত করলো। মাকে দেখতে পেয়েই ছুটে আসেন কমলা, মায়ের ধূলিধুসরিত পা ধুয়ে দিয়ে, শরবত খেতে দেন। মায়ের সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর  করে মাকে বাড়ী পাঠিয়ে দেন।
   
  কিছুক্ষণের মধ্যে স্টেশনে আবহাওয়া পালটে যায়। সকাল থেকে কতগুলো ট্রেন আটকানো হল। কোন গণ্ডগোল  নেই। সবাই মিলে বাংলাভাষা চালু করার স্লোগান দিয়ে রেললাইনে বসে পড়লেই হলো। এবার যেন অন্যরকম। পুলিশের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে স্টেশনে। ওরা লাঠি আর বন্দুকের বাট দিয়ে মারতে শুরু করল আন্দোলনকারীদের। কিন্তু পিকেটিং ছেড়ে নড়ছে না কেউ। মার, কত মারবি।সকালে রেল অবরোধ কর্মসূচী শান্তিপূর্ণভাবেই সমাধা হয়। যদিও অবস্থানের সময়সূচী ছিল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, কিন্তু শেষ ট্রেনটি ছিল বিকেল ৪টা নাগাদ, যার পরে  গণ অবস্থান স্বভাবতই শিথিল হয়ে যাবার  কথা। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই অসম রাইফেলসের জওয়ানরা জায়গাটাকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। বেলা ২-৩৫ নাগাদ বিনা প্ররোচনায় তারা অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীদের নির্মমভাবে লাঠি ও বন্দুকের কুঁদো দিয়ে পেটাতে থাকে। এলোপাথাড়ি লাঠিচার্জে অবস্থানকারী জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ও দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে যে যেদিকে পারে পালাতে থাকে। কমলার ছোটবোন মঙ্গলা পুলিশের লাঠির ঘায়ে মাটিতে পড়ে যায় ও সাহায্যের জন্য কমলার উদ্দেশ্যে চিৎকার করতে থাকে। ইতিমধ্যে অসম রাইফেলসের জওয়ানরা পলায়নরত জনতার উপর গুলিবৃষ্টি শুরু করে। মঙ্গলাকে বাঁচাতে কমলা ছুটে গেলে একটি গুলি তাঁর ডান চোখ ভেদ করে  মাথা চুরমার করে দেয়। অন্যান্য আহত ও গুলিবিদ্ধ অবস্থানকারীদের সাথে কমলাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখনেই তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এক মাস বাদে তার জ্ঞান ফিরলেও বাকি জীবনটা পঙ্গু  হয়ে  গেলো।
 
ছোট শহর শিলচর। রেলস্টেশনে গুলি চলেছে। নিহত অনেক, আহত আরো প্রচুর। মানুষ ভীড় করে হাসপাতালে। ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছে কমলার গুলি লেগেছে। জীবিত না মৃত নিশ্চিত নয় কেউ। হাসপাতাল ঘিরে রেখেছে পুলিশ, মেয়ের দেখা পেলেন না সুপ্রভাসিনী। কমলার সঙ্গীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে তাঁর সামনে। 'নিয়ে গিয়েছিলাম আপনার মেয়েকে, ফেরত আনতে পারলাম না '। পাথরের মতন নীরব হয়ে বসে থাকেন তিনি। হঠাৎ মনে পড়ে মঙ্গলার কথা, মঙ্গলা কোথায়? মঙ্গলার কথা কেউ বলছে না কেন?
    মঙ্গলাও তখন হাসপাতালে। পুলিশের লাঠি ও বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে বীভৎসভাবে আহত, সংজ্ঞাহীন। মঙ্গলার জ্ঞান ফিরলো একমাস পর, তারপর সারাজীবন বয়ে বেড়ালো পুলিশী অত্যাচারের যন্ত্রণা, বেঁচে থাকলো হাড় জিরজিরে রোগা শরীরে চিররুগ্ন হয়ে।
    কমলার মৃত্যুশোকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন মা সুপ্রভাসিনী। ঘুম হতো না। ঘুমোলে স্বপ্নে ভেসে উঠত কমলার মুখ, তাঁর জেদী ঘোষণা-—গ্র্যাজুয়েশন তিনি নেবেনই। ঘুম ভেঙে উঠে বসতেন। কাছাড়ের ডিসি এসেছিলেন আর্থিক সাহায্যের প্রস্তাব নিয়ে, নেন নি। 'যারা গুলি করে মেরেছে আমার মেয়েকে তাদের হাত থেকে নেব সাহায্য? কখনও  নয়'। ছুটে যান বাড়ির ছাদে। মানসিক ভারসাম্য না থাকায় পড়ে যান ছাদ থেকে। সেই থেকে মনোবিকার চিরস্থায়ী। অবস্থার উন্নতি হবে ভেবে তাঁকে শিলচর থেকে গুয়াহাটি নিয়ে যান বড় ছেলে রামেন্দ্র ভট্টাচার্য্য। লাভ হয়নি। মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় মৃত্যু হয় শহীদ জননীর।

সেজদি ও মঙ্গলা দু'জনের বিয়ে হয়েছিল। তাঁরাও চলে গিয়েছিলেন গুয়াহাটি। পুলিশী অত্যাচারের যন্ত্রণা সঙ্গ ছাড়েনি সারা জীবন। যাঁর শাড়ি পরে শহীদ হয়েছিলেন কমলা, সেই সেজদিও পরবর্তী জীবনে মানসিক সমস্যার শিকার হন, বিশেষ করে কেউ কমলার কথা বললে সেই সমস্যা আরো প্রকট হত।
   বড়দি বেণু চক্রবর্তী পরে আবার চেষ্টা করেছিলেন কিছু সরকারী সাহায্য যোগাড় করতে এই বিধ্বস্ত পরিবারটির জন্য। পারেননি। তবে বড়দির আসল দুঃখ ছিলো স্বীকৃতির প্রশ্নে। বাংলাভাষার মূল স্রোতের কাণ্ডারীরা কমলার আত্মত্যাগকে কোনদিন যথোচিত সম্মান দেন নি। অনেক চেষ্টা করা হয় যাতে এগারো জন নিহতের ভাষা শহীদ স্বীকৃতি সরকারীভাবে প্রদান করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ শহীদদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য শিলচর স্টেশনের নাম 'ভাষা শহীদ স্টেশন' রাখার দাবি করছিলেন। অবশেষে ২০১১ সালে ভারত সরকার সে দাবি মেনে নেন।

২০১১ সালে, ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ কমলা ভট্টাচার্য্যের মূর্তি স্থাপন কমিটির পক্ষ থেকে গোপা দত্ত আইচ ছোটেলাল শেঠ ইন্ষ্টিটিউটের প্রাঙ্গণে কমলার একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করেন। এই বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন কমলা।

  এমন দিন আসতে পারে হয়তো দুই বাংলার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ধারক বাহকেরা অনুভব করতে পারবেন যে কমলা ও তাঁর দশ সাথীর জীবন বলিদান ২১শের চার শহীদের মতন চিরস্মরণীয়। হয়তো একদিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং অসম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ১৯৬১ -র ১৯ শে মে নিয়ে গবেষণা করার মতন প্রাজ্ঞতা অর্জন করবে, মহান কোন কবির কলমে শিলচর স্টেশনের মহাকাব্য রচিত হবে,হয়তো পশ্চিম বাংলা মে মাসকে বাংলা ভাষার মাস হিসেবে চিহ্নিত করবে, হয়তো কোন নারীবাদী সাহিত্যে কমলার কথা লেখা হবে, হয়তো  গৌহাটী -কলকাতা শহরের কোন রাস্তার নামফলকে শোভা পাবে কমলার নাম, হয়তো আরো শ্লাঘনীয় অনেক কিছু ঘটতে পারে, নাও পারে। আমরা বাংলা ভাষাভাষীদের প্রত্যাশা কিন্তু থেকেই যাবে।

কাজরী,
২০১৭

বিশ্ব কবিতা দিবস।























© সুনীতি দেবনাথ 


          
রাষ্ট্র সংঘের UNESCO - এর ডিরেক্টর জেনারেল ইরিনা বোকোভা বিশ্ব কবিতা দিবস সম্পর্কে তাঁর বাণী দিতে গিয়ে বলেছিলেন, 

"...  the men and women whose only instrument is free speech, who imagine and act, UNESCO recognizes in poetry its value as a symbol of the human spirit’s creativity. By giving form and words to that which has none – such as the unfathomable beauty that surrounds us, the immense suffering and misery of the world – poetry contributes to the expansion of our common humanity, helping to
increase its strength, solidarity and self-awareness."

ওপরপক্ষে বার্ণার্ড শ কবিতার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, " মানুষ যা কথায়
প্রকাশ করতে পারে না, তা প্রকাশ করে গানে,আর গানেও যার প্রকাশ সম্ভব নয়, তা প্রকাশ করে  কবিতায় "।

আদিম গুহামানব তখন গুটিকয়েক শব্দ সৃষ্টি করে অপার বিস্ময়ে দেখতো তার পরিপার্শ্বকে। একদিন জানা অজানা শব্দের মৌলিক ছবি এপাশ ওপাশ সাজিয়ে চাইলো মনের আকুলিবিকুলি ভাবের খেলা সাজিয়ে নিতে। চাইলো গুহার দেয়ালে ইচ্ছে মাফিক সাজাতে, অবাক এ কী সৃষ্টির অরূপ রতন! কবিতা মুচকি হেসে বললো আমাকে চেনো কি?তোমার মনে, তোমার ভাবনায় ঘুমিয়ে ছিলাম জেগে উঠেছি! অরণ্যানী বৃক্ষছায়া ফুলেল লতা বর্ণিল গুল্মের ঝোঁপ আকুল ঝর্ণা বহতা নদী সুরধুনী আকাশ মাখা নীলে সজ্জিতা ধরিত্রী নাতো নন্দনকানন!   কবিতা এখানে মৃদুল ছন্দে পরমানন্দে নৃত্যপরা ললিত লবঙ্গলতিকা! পৃথিবী বদলায় প্রকৃতি - সভ্যতা বদলায় বদলায় মানুষ। বদলায় মানুষের মনন চিন্তন অনুভবের জটিল ব্যাকরণ। কবিতাও অস্তিত্বের হেরফেরে কেবলই বদলে যায় নিত্য। তবু কালজয়ী সৃষ্টি যা অনন্তকালের পরিধিতে অমরত্বের উজ্জ্বল দিগন্তের 
এখানে ওখানে সেখানে চিরন্তনের সাক্ষর রেখে যায়। কবিতার কোন সীমানা নেই, কবির কোন নিজস্ব দেশ নেই, কাল নেই। সারাটা পৃথিবী জোড়া কবিতার মানচিত্র। আর সেই মানচিত্রে যখনই যেখানে দ্রোহ, প্রেম, বিপ্লব, প্রতিবাদ কিংবা মানুষের ন্যায়সঙ্গত দেনাপাওনার, মিলনের অভিব্যক্তি শৈল্পিক সৃষ্টিতে কবি প্রত্যয়ে প্রকাশ করেন, তখন তা সারা বিশ্বের জনগণের সম্পদ হয়ে ওঠে। পাবলো নেরুদা পশ্চিম গোলার্ধের কবি হয়েও তাই পূর্ব গোলার্ধের আমাদেরও কবি। রবীন্দ্রনাথ তাই বিশ্বকবি। তাই কালিদাস, শেক্সপিয়ার সকলের কবি। অনুন্নত ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের দাবি যথার্থ উন্নত ভাষার কবিদের উজ্জ্বল সৃষ্টির সংস্পর্শে নিজেদের সৃষ্টির উন্নয়ন।তাই দাবি উঠলো রাষ্ট্রসঙ্ঘে একটা বিশেষ দিনকে ' বিশ্ব কবিতা দিবস ' উদযাপনের জন্য একটা দিন স্থির করতে। বিশেষ করে আমেরিকা এই প্রস্তাব উত্থাপন করে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘ UNESCO - এর উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে ২১ মার্চ তারিখটিকে ' বিশ্ব কবিতা দিবস ' হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিনটি পালনের উদ্দেশ্য হল বিশ্বজুড়ে কবিতা পাঠ, কবিতা রচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করা। UNESCO - এর বিশেষ  অধিবেশনে এই দিনটি ঘোষণা করার সময় বলা হয় , "এই দিবস বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনগুলিকে নতুন করে স্বীকৃতি ও গতি দান করবে।"
আগে অক্টোবর মাসে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হত। প্রথম দিকে কখনো কখনো পাঁচ অক্টোবর এই দিবস পালিত হলেও বিশ শতকের শেষভাগে রোমান মহাকাব্য রচয়িতা ও সম্রাট অগস্টাসের রাজকবি ভার্জিলের জন্মদিন স্মরণ করে  পনেরো অক্টোবর কবিতা  দিবস পালনের প্রথা শুরু হয়। অনেক দেশে এখনো      অক্টোবর মাসের কোনো দিন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কবিতা দিবস পালন করা হয়। এই দিবসের বিকল্প হিসেবে অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসের কোনো দিন কবিতা দিবস পালনের প্রথাও চালু আছে। 
    যদি বলা হয় কবিতার সৃষ্টি হয় আর স্বচ্ছ -বিশুদ্ধ মনন ও যৌক্তিক চিন্তন থেকে হিরন্ময় আঙ্গিকে অনুভূতির বর্ণালি পথে আবগের আতিশয্যে সৃষ্ট হয়, দিব্য প্রকাশিত হয়,  ভুল বলা হবে না। অতীত কবিতার উদ্বোধনী পশ্চাদ্দেশের ভিত্তি, বর্তমান বা সমকাল মনন চিন্তনের প্রত্যক্ষ প্রসার আর অনাগত ভবিষ্যৎ অনুভূতির কল্পিত, স্বপ্নদর্শী ক্ষেত্র, তাহলেও ভুল বলা হবে না। সেই অর্থে কবি ত্রিকালদর্শী স্রষ্টা। ইচ্ছের লালন থেকে বেঁচে থাকা বেড়ে ওঠা স্বপ্ন দেখা সবই বিচিত্র আঙ্গিকে উপমা উৎপ্রেক্ষা চিত্রকল্প শব্দ প্রয়োগ কুশলতা নানা কিছুতে সেজে কবিতা জন্ম নেয়। কবিতার বিষয় সামগ্রিকভাবে জীবন, যাপন, প্রেম, বেদনা, প্রকৃতি, দ্রোহ, সংগ্রাম, বিপ্লব, আধিভৌতিক, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক ইত্যাদি হরেক কিছু । বিজ্ঞান ইতিহাস দর্শন সমাজ রাজনীতি অর্থনীতি মনোবিজ্ঞান সবকিছুই কবিতার দখলে। তাই বিশ্ব কবিতা দিবস পালনের তাৎপর্য সুগভীর। আত্মোপলব্ধি ও প্রকাশের পথ বেয়ে কবিতা হয়ে ওঠে জীবন দর্শন। গুহামানব থেকে শুরু করে আজকের বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে মানুষ কবিতার কাছে প্রার্থনা জানাতে বাধ্য, " আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা / আমি যে পথ চিনি না...।" 
   আজকের দারিদ্র্যক্লিষ্ট, সন্ত্রাসবাদ নিপীড়িত, বারুদের গন্ধে আচ্ছন্ন, অবক্ষয়ের পীড়নে আর্ত, মানুষপশুর দাপটে ভয়ার্ত পৃথিবীতে ব্যক্তি মানুষ যেমন, তেমনি সমষ্টি মানুষও একটা ভীতির কবলে উৎকণ্ঠিত। পরিত্রাণের পথ খুঁজছে মানুষ,মানুষের কবিতাও পথের অনুসন্ধানে। শিশু, যুবক- যুবতী, বৃদ্ধ -বৃদ্ধা নির্বিশেষে সকলেরই রক্তস্রোত  আজ রাজপথ জনপদে প্রবাহিত হয়। এইখানে কবিতা তীব্র তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রতিবাদ ফুঁসে ওঠে। রক্তস্নাত কবিতা হত্যাকারীর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে, অসহায় মানুযের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়ায়। সাম্রাজ্যবাদীর দুর্বার ক্ষুধা যখন শক্তিমত্ততায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলির স্বাধীন পতাকা ছিনিয়ে নিতে উদ্যত হয়, সার্বভৌমত্ব কেড়ে নিতে  চায়, কবিতা তখন অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে দুর্বার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। কবিতা মানবিকতার সনদনামা। 'হিংসায় উন্মত্ত পৃত্থী '-তে শান্তিবারি বর্ষণ করতে পারে কবিতা। 
  মারুফ অমিত কবিতা সম্পর্কে ভারি সুন্দর বলেছেন,  "কবিতা ভালোবাসার ভাষা,কবিতা প্রতিবাদের ভাষা। কবিতা বলতে কী আবেগের বিজ্ঞানকে বুঝানো হয়ে থাকে? আবেগ ও বিজ্ঞান এ দুটির সমমিশ্রণ ঘটলেই পঙ্ক্তিমালাগুলো কবিতা রূপ ধারণ করে। কবিতা শিল্পের একটি শাখা যেখানে ভাষার নান্দনিক গুণাবলীর ব্যবহারের পাশাপাশি ধারণাগত এবং শব্দার্থিক বিষয়বস্তু ব্যবহার করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, কবিতা প্রতিমুহূর্তে আচরণে-আবরণে, আহ্বানে নিজের অস্তিত্ব তথা বোধজাত উপলব্ধি ঠিক রেখে নিজেকে ভাঙ্গে আবার গড়ে।"
    শক্তি ও আধিপত্য বিস্তারের লোলুপ অক্টোপাস আজ পৃথিবীর সকল সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার যন্ত্রসূত্র! মানুষ আজ হৃদয় আর বিবেকবোধ হারিয়েছে।যেন এক নখদন্ত বের করা ভয়াবহ সময়ের যন্ত্র মানব। মানব ইতিহাস আজ যেন এক বীভৎস ক্ষত! আজ বিশ্ব কবিতা দিবসে আবারো খুব গভীর ভাবে কবিতার প্রয়োজনে হৃদয়ে আলোড়ন জাগছে । বিবেকের জাগরণে, হৃদয়ের উজ্জীবনে, মানবতার সমূহ সংযোগে, জীবন-ভাবনার বিনির্মাণে কবিতার সার্বজনীন সৃষ্টি, পাঠ ও পরিক্রমা আজ মানুষের মানবিক বিকাশে বড় বেশি প্রয়োজন। একমাত্র কবিতাচর্চা-ই মানুষের জন্য এনে দিতে পারে মনুষ্য অস্তিত্বের মূল্যবোধ।
কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর “আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি” কবিতা থেকে উদ্ধার করছি, 
“জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা,
কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্যদানা কবিতা।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে"

।বিশ্ব কবিতা দিবসে আজ নতুন করে ভাবতে  হবে কবিতাচর্চার প্রয়োজনের কথা। মানুষের ' হৃদয় নন্দনবনে ' মানব মহিমার শতপুষ্পকে কবিতাই পারবে নব নব রূপে বিকসিত করতে।বিশ্ব মানবিকতা কবিতার উচ্চারণে বিজয়ী হবে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা উচ্চারণ করে বলবো কবিতাই পারবে সেই মানব পৃথিবীকে গড়ে তুলতে। আর সেখানেই বিশ্ব কবিতা দিবস পালনের সার্থকতা। 
      
"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উত্সমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়,
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি---
পৌরুষেরে করে নি শতধা ..."।


কাজরী,
২১ মার্চ, ২০১৭

দুরন্ত এক ঝড়ের নাম রবীন সেনগুপ্ত















© সুনীতি দেবনাথ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশিষ্ট ' যুদ্ধ চিত্র সাংবাদিক ' রবীন সেনগুপ্ত চলে গেলেন। ভারতের নানা জাতীয় স্তরের পত্রিকায় সংবাদ শিরোনামে গর্বের সঙ্গে তাঁর যাবার সংবাদ উল্লেখ করা হল আন্তর্জাতিক সংবাদে। The Hindu পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম " Veteran 'war ' photo journalist Rabin Sengupta dies ". সাংবাদিক সৈয়দ সাজ্জিদ আলি ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে  12.37 মিনিটে সংবাদ The Hindu - এর নিউজ রুমে প্রেরণ করলেন। ভারতের স্বল্প সংখ্যক 'ওয়ার ' সাংবাদিকের অন্যতম রবীন সেনগুপ্ত, যিনি 1971সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর সুবিস্তৃতভাবে  পরিবেশন করেছেন তাঁর চিত্র সাংবাদিকতায়। সে সংবাদ প্রেরণ করা হয় 7 ফেব্রুয়ারি, 2017 তারিখে। তাতে বলা হল রবীন সেনগুপ্ত আগরতলায় 87 বৎসর বয়সে পরলোকগত হয়েছেন।
  রবীন সেনগুপ্ত মঙ্গলবার সকালে আগরতলার জি.বি.পন্থ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন ।  ডেইলী দেশের কথা পত্রিকায় বলা হয়েছে তাঁকে আগরতলার আই এল এস হাসপাতালে আগের দিন ভর্তি করা হয় এবং পরদিন অর্থাৎ সাত ফেব্রুয়ারি সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।  তিনি বার্ধক্যতাজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এই বয়োবৃদ্ধ চিত্র সাংবাদিকের মৃত্যুসংবাদ উত্তর পূর্বাঞ্চলের মিডিয়া সার্কেলে গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি করেছে বলে অনুমান করা হয়। সর্বভারতীয় অন্যান্য পত্রিকা যেমন দি টাইমস অফ ইণ্ডিয়া,টেলিগ্রাফ প্রভৃতিতেও যেমন, তেমনি ত্রিপুরার নানা স্থানীয় পত্রিকায়ও বিশদভাবে রবীন সেনগুপ্তের প্রয়াণের সংবাদ শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে।
   রবীন সেনগুপ্ত 1930 সালে আগরতলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন ত্রিপুরা একটি রাজন্যশাসিত স্বাধীন রাজ্য এবং তাঁর জন্মের বহু পরে 1949 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে ত্রিপুরা স্বাধীন ভারতের সঙ্গে যোগদান করে। রবীন সেনগুপ্তের পূর্বপুরুষেরা ঢাকার বৈদ্যবংশীয় ছিলেন। পাহাড় লুঙ্গা অরণ্যানী আর ছোট ছোট নদী ছড়া নিয়ে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যটি মনোরম। এই ত্রিপুরা রাজ্যে 1840 খ্রিস্টাব্দে রবীন সেনগুপ্তের পূর্বপুরুষ সূর্যমণি সেনগুপ্ত ঢাকার বিক্রমপুর থেকে তখনকার ত্রিপুরার রাজার আমন্ত্রণে এই রাজ্যে বসবাস করতে আসেন। তিনি ছিলেন একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক তথা বৈদ্য। তখন ত্রিপুরার রাজা ছিলেন কৃষ্ণ কিশোর মাণিক্য। ত্রিপুরায় নানারকম ভেষজ লতাপাতা,জড়িবুটির প্রাচুর্য দেখে সূর্যমণি মুগ্ধ হয়ে এখানে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের বংশধরগণও ত্রিপুরাকে মানিয়ে নিয়ে ভালবেসে ফেলেন। পূর্বজ সূর্যমণির সুবাদে রাজপরিবারের অন্দরমহলে প্রবেশ করার অধিকার পরবর্তীতে তাঁরা পান এবং সেখানকার জাঁকজমক জৌলুস আর সুন্দরী রাণী রাজকন্যাদের দেখে অল্পবয়েসী রবীন সেনগুপ্তের চোখ যেন ঝলসে যেতো।  রবীন সেনগুপ্তের পিতা প্রফুল্ল চন্দ্র সেনগুপ্ত পি.সি.সেন নামে অধিক খ্যাত ছিলেন। তিনি সু্দক্ষ ফটোগ্রাফার ছিলেন। ফটোগ্রাফি বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা ছিলো। পিতার কাছেই এই বিদ্যায় রবীন সেন শিক্ষা পেলেন। পি.সি.সেন মহাশয় আধুনিক জাদুবিদ্যায় শখের জাদুকর ছিলেন। তাঁকে ত্রিপুরার আধুনিক জাদুর আদি পুরুষ বলা হয়। যাইহোক ফটোগ্রাফিতে তাঁর দক্ষতা প্রবাদতুল্য ছিলো। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রমেশকে নিয়ে 1910 সালে ' সেন এণ্ড সেন ' নামে স্টুডিও স্থাপন করেন। এদিকে রমেশের ফটোগ্রাফিতে গভীর ঔৎসুক্য ছিলো আর তাঁর উৎসাহ রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের পুত্র সম্বরন চন্দ্র দেববর্মার অনুপ্রেরণায় দিনদিন বাড়তে লাগলো।মহরাজ বীরচন্দ্র দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ সর্বজন বিদিত।
 পড়াশুনা শেষ করে রবীন সেন স্টুডিও পরিচালনার দায়িত্ব নেন। স্টুডিওটির তখন তিনটি শাখা। কিন্তু এতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাঁর অন্তরাত্মা কি চায় তা তাঁর অজানা ছিলো না। তাই তাঁর প্রিয় রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে যেতেন এবং ছবির পর ছবি তুলতেন। 1952 সাল থেকে তাঁর ফটোগ্রাফ আনন্দবাজার পত্রিকা, অমৃতবাজার, যুগান্তর ,হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড এসব পত্রিকায় প্রকাশিত হতে লাাগলো।
    স্মৃতি থেকে রবীন সেনগুপ্ত জানিয়েছিলেন তাঁর প্রথম প্রকাশিত ফটোগ্রাফটি ছিলো ভূট্টা খেতে কর্মরতা এক আদিবাসী বালিকার। ছবিটিতে মানব চরিত্রের মাহাত্ম্য ও শ্রমের মর্যাদার যৌথ বন্ধন সূচিত হয়েছে। তিনি জীবন জোড়া কঠোরতর সত্যের মুখোমুখি রুখে দাঁড়িয়ে গেছেন। 1971সালে সমগ্র বাংলাদশে ব্যাপকভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন। শত্রুপক্ষের ভয়ঙ্কর পাশবিকতা,নিষ্ঠুরতা ও নিষ্পেষণের মধ্যে একটা জাতি প্রাণপণে সংগ্রাম করে কিভাবে   গড়ে উঠছিল তা তিনি দেখেছেন। তিনি আরো দেখেছেন কি দুুর্গতির চরমে মুক্তিবাহিনীকে যেতে হয়েছে, সহায়ক ভারতীয় বাহিনী কতখানি বিপর্যস্ত হয়েছে। অবশেষে মুক্তিবাহিনীর বিজয় হলো, রক্তে রাঙা সূর্যের মত উদিত হলো একটা দেশ — বাংলাদেশ! একটি অরণ্য অঞ্চলে  বিশালাকার ও ফ্রেমে আবদ্ধ একটি বক্তব্যরত প্রতিকৃতিকে ট্রেণিং ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর ক্যাডাররা স্যালুট জানাচ্ছে এমন একটি ফটোগ্রাফ রবীন সেনগুপ্ত তুলেছিলেন। যুব সেনানীদের মুখমণ্ডল ইস্পাতদৃঢ় ও ভাবাবেগরহিত, এ যেন যুবশক্তির ক্ষতবিক্ষত মুখাবয়বের প্রতীকী রূপায়ন যাতে সহজ সারল্যের লেশমাত্র নেই।
   রবীন সেনগুপ্ত রাতদিন এক করে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে চরকির মত ঘুরে বেড়িয়েছেন, তথ্যপূর্ণ ফটোগ্রাফ তুলেছেন। বর্তমানে যে 'embedded photojournalism ' অর্থাৎ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যে চিত্র সাংবাদিককে পাঠানো আর তাদের কর্তৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে ছবি তোলার রীতি  প্রচলিত হয়েছে, সেনগুপ্ত তার বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর মতে এতে চিত্র সাংবাদিককে প্রকৃত সত্য থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপরে তাঁর লেখা বই ' চিত্রসাংবাদিকের ক্যামেরায় মুক্তিযোদ্ধা 'বইটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত হলে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং পুরস্কৃত করেন। এছাড়াও তাঁর অন্য একটি বই ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।
   ফটোগ্রাফি সেনগুপ্তকে বহু স্থানে নিয়ে গেছে। সেসব স্থানের প্রকৃতি, বৃক্ষলতা, অরণ্যানী আর মানুষ অকপটে তাঁর ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। মানুষের ভালবাসা তাঁকে ধন্য করেছে। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রাজিলে গেছেন তিনি। 1959 সালে ব্রাজিলের একটি ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় তিনি স্টিল ফটোগ্রাফিতে প্রথম স্থান পেয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি ও স্বীকৃতি আদায় করে নিলেন। মস্কো থেকে এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার নেন তিনি। সারাদেশের পত্রিকায় সেদিন কী উল্লাস, কী আনন্দ! তিন বছর পর গ্রেট ব্রিটেনের ' রয়্যাল ফটোগ্রাফি সোসাইটি'- এর সদস্যপদ লাভ করেন।
   একজন সমর্পিতপ্রাণ মার্কসবাদী হলেও জওহর লাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও হৃদ্যতা ছিলো। জ্যোতি বসু ও ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা ছিলো। চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে এতো ঘনিষ্ঠতা ছিলো যে তাঁর অনেক ছবি তাঁর আর্কাইভে ছিলো।
   রবীন সেনগুপ্তকে একটা পরিচিতির ফ্রেমে এভাবে বাঁধা যায়' যুদ্ধ ' চিত্র সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিশেষ করে ডকুমেন্টারী ফিল্ম নির্মাতা, সুলেখক, প্রাবন্ধিক, সংবাদপত্রে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ধারাবাহিক লেখক, চিত্র সংগ্রাহক, বামপন্থী রাজনীতি বিশেষজ্ঞ, দরদী বার্তালাপকারী এবং সর্বোপরি মানবদরদী ও অগাধ মানবপ্রীতি সম্পন্ন মানুষ তিনি। রাজ্যের উমাকান্ত একাডেমি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি। মৃত্যুকালে স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা রেখে গেছেন তিনি। 1949 সালের 27 জানুয়ারি সরকারের খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে ছাত্ররা যে ভুখা মিছিল করে, তাতে পুলিশ নির্দয়ভাবে লাঠিচার্জ ও গুলি চালায়। একমাত্র সেনগুপ্তের দেহে দুটি গুলি লাগে। নির্ভীক মানুষ ছিলেন তিনি। 1956 সাল থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। আদিবাসীদের নিয়ে তাঁর রঙীন ছবি ' দি টেলস অব ট্রাইবেল লাইফ অব ত্রিপুরা ' দেশবিদেশে প্রশংসা পায়। তিনি লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী, গ্রিমসেস অব ত্রিপুরা ছবিগুলিও করেন। তাঁর বহু বিচিত্র জীবন কথা সংক্ষিপ্ত পরিসরে প্রকাশ অসম্ভব। এই ' গ্রেট ' মানুটির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শেষ কথা বলবো সরকারি উদ্যোগে তাঁর ফটোগ্রাফ, ফিল্ম,ডকুমেন্টারী সহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী  সরকারি উদ্যোগে আগরতলা মিউজিয়ামে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অনেক কিছু নাকি এখনই নষ্ট হয়ে গেছে।

কাজরী,
১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বনাম শহীদ দিবস

















            একুশে ফেব্রুয়ারি
------------------------------------------
© সুনীতি দেবনাথ

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তথা শহীদ দিবস। বাংলাভাষা সারাটি বিশ্বের একমাত্র ভাষা, গৌরবের ভাষা যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার শিরোপার অধিকারী। এ ভাষা বাঙালির আত্মা ও শ্রেষ্ঠ গর্ব। ' আ মরি বাংলাভাষা '!
    ‘বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকোনো উঠোনে ঝরে রৌদ্র, বারান্দায় জাগে জ্যোৎস্নার চন্দন ! বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে । খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে নদীও নর্তকী হয়’ ।
বাংলাদেশের জনগণের গৌরবোজ্জ্বল দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। আলোকোজ্জ্বল নীলাকাশের অবারিত রৌদ্র অঝোরে ঝরে পড়ে বাংলার ' নদী জপমালা ধৃত প্রান্তর'- এ হিল্লোলিত সবুজের আন্দোলনে। জ্যোৎস্নাস্নাত অঙ্গনে বাংলা ভাষার মধুরিমা আলগোছে স্বপ্নের কথামালা রচনা করে যেতো। এমনি বাংলাদেশ, এমনি মাধুর্যমাখা বাংলাভাষা। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাজনের পর পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অধীনে গেল। পাকিস্তান জবরদস্তির রাজনীতিতে উর্দু ভাষাকে পূর্ববঙ্গেরও রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলো। নিখিল বাঙালির আত্মার চেতনা বিক্ষোভেল ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করলো ১৯৪৭ সালের নভেম্বর ডিসেম্বর মাস থেকে। ক্রমে এই আত্মার আগুন ১৯৪৮ সালের মার্চে একটা আন্দোলনের পরিসীমায় বিস্তৃতি লাভ শুরু করে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভয়ঙ্কর আকারে সে আন্দোলন বাংলার মাটিতে রক্তের হোলিখেলা শুরু করলো। বাংলার শিক্ষাঙ্গনে অঙ্কিত হল রক্তের আলিম্পন। সেদিনই বাংলার যুবসমাজ দেখালো মাতৃভাষার মূল্যের কাছে প্রাণ কত তুচ্ছ।
   সেই একুশে ফেব্রুয়ারি সকালবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ছাত্রেরা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে বেরিয়ে এলো নির্ভীক চিত্তে। নিষ্ঠুরতার চরম পর্যায়ে গিয়ে  পুলিশবাহিনী ছাত্রদের উপর গুলি বর্ষণ শুরু করে। কী কলঙ্কময় এই ইতিহাস। পরিণতিতে একে একে রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সাত্তারের নিষ্প্রাণ দেহ। তাঁদের  সহ আরো ক 'জন ছাত্রযুবা হতাহত হলেন। এই নিষ্ঠুর  ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে প্রতিবাদী ঢাকার জনতা সমবেত হলেন। অসহনীয় নানা  নির্যাতন হলেও ছাত্রদের সঙ্গে  সাধারণ জনতা  প্রতিবাদ জানাতে পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি আবার  রাজপথে নেমে এলেন । তাঁরা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় অংশগ্রহণ করলেন। ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারির এই ঘটনায় আরও তীব্রতর হলো ভাষা আন্দোলন । ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তখন থেকে প্রতি বছর এ দিনটি জাতীয় ‘শোক দিবস’ তথা 'শহীদ দিবস ' হিসেবে পালিত হয়ে  আসছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় একুশে  ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা এক মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি এবং পরে একাধিক্রমে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষকবৃন্দ, ঢাকাস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের ব্যক্তিবৃন্দ, সাধারণ জনগণ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। আর এসময়  করুণ সুরে বাজতে থাকে " আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি " গানটি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষিত হয়। এদিন শহীদ দিবসের তাৎপর্য তুলে রেডিওএইচএস টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অণুষ্ঠানের আয়োজন করে। দেশের সংবাদপত্রগুলিও বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে চেতনায় উদ্দীপিত হয়ে বাঙালিরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আজ তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি লাভ করেছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি:সম্পাদনা

কানাডার ভ্যাঙ্কুবার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম প্রাথমিক উদ্যোক্তা হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব কোফি আন্নানের কাছে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস  অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি রাষ্ট্রসংঘের  সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।২০১০ সালের
২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করবে জাতিসংঘ এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে বাংলাদেশ। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
    একুশে ফেব্রুয়ারির রোদনভরা স্মৃতি নিয়ে প্রথম যে কবিতা  রচিত হয়, তা উদ্ধৃত করে বর্তমান আলোচনা সমাপ্ত করা হবে।আন্তর্জাতিক  মাতৃভাষা দিবস পালন করার বিশেষ তাৎপর্য হলো বাংলা ভূখণ্ডে মাতৃভাষার অধিকার প্রাপ্তির জন্য আত্ম চেতনাশীল যে জনগোষ্ঠী জীবনপণ সংগ্রাম করেছেন, আত্মাহুতি দিয়েছেন তা সমগ্র বিশ্বে আদর্শ ঘটনা। মাতৃভাষা মায়ের মত মানুষের চেতনাকে পরিশীলিত করে, সংস্কৃতিবান আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে। সর্বোপরি নিজ মাতৃভাষার পাশাপাশি অন্যের মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা করতে শেখায়। এতে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বাতাবরণে পৃথিবীর সংস্কৃতি, শান্তি ও মানবিকতা
সুরক্ষিত হবে।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে নিজ সংস্কৃতি ও বহুভাষাবাদের জনজাগরণ ঘটবে
আর মাতৃভাষা শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে। নিজের মাতৃভাষার প্রতি যে মমত্ববোধ ও শ্রদ্ধা অন্তরে আছে, এই দিবস পালনের মাধ্যমে তা অপরের মাতৃভাষার প্রতি সঞ্চারিত হবে। এতে ছোট ছোট গোষ্ঠীর মাতৃভাষাও আত্ম সম্প্রসারণের আস্থা খুঁজে পাবে।

অমর একুশে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে একুশের প্রথম কবিতা
-------------------------------------------------------------------------------

কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী রচিত একুশের প্রথম কবিতাঃ
----------------------------------------------------------------------------------

'আজ আমি এখানে কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি...'

ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে—রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য—বাংলার জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।”
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।

আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে
নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো
হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোনো
সরকারি চাকুরে।
তোমারই আমারই মতো
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে
পারতো,
আমারই মতো তাদের কোনো একজনের
হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য হয়ে গিয়েছিল,
তোমারই মতো তাদের কোনো একজন হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ দিতে গিয়েছিল।
এমন এক একটি মূর্তিমান স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল
সেই সব মৃতদের নামে
আমি ফাঁসি দাবি করছি।

যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে
আমি ফাঁসি দাবি করছি
যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবি করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।

পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন,
দেশের চল্লিশ জন সেরা ছেলে
মা, বাবা, নতুন বৌ, আর ছেলে মেয়ে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কী ভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার,

যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার কোনো পদক্ষেপ।

যদিও অগণন অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে।
যদিও ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবু তোমাদের শহীদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।

খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত
কোনো দিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে,
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
ন্যায়-নীতির দিন
হে আমার মৃত ভাইরা,
সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে
ভেসে আসবে
সেই দিন আমার দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।

ত্রিপুরা, ভারত।
১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

বাবা আলাউদ্দিন খাঁ






















© সুনীতি দেবনাথ


আমাদের দেশ ভারত হচ্ছে সঙ্গীতের দেশ। এদেশের রাজা -মহারাজা, নবাব -বাদশা -সুলতানগণ তাঁদের দরবারে প্রতিষ্ঠিত সুগায়কদের সম্মানিত আসনে বসিয়ে কোন প্রাচীনকাল থেকে সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীতকে শ্রদ্ধা, সমাদর ও সম্মান দেখিয়েছেন। উচ্চাঙ্গসংগীতের অন্যতম অভিধা তাই দরবারী সঙ্গীত। আরো আগে বৈদিক সভ্যতায় সঙ্গীতের প্রাধান্য ছিল। বেদের ওম্ ধ্বনি থেকে সৃষ্ট সপ্ত স্বর গড়ে তুলেছে ক্লাসিক্যাল বা ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুবিশাল জগৎ। আর বেদের তৃতীয় সামবেদ তো সঙ্গীতের সমাহার। ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত গড়ে উঠেছে সঙ্গীত, নৃত্য আর যন্ত্রসঙ্গীতের সমবায়ে। উত্তর ও দক্ষিণ ভারত ভেদে তা আবার হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও কর্ণাটকী সঙ্গীত এই দুটি ভাগে বিভক্ত। এই বিভাজনের কারণ গায়ন শৈলী, অনুশীলন পদ্ধতি ও অন্যান্য কারণ। সমাজের উচ্চকোটির মানুষের জন্য এই অভিজাত সঙ্গীত শৈলীর পাশাপাশি প্রাকৃতজনের সৃষ্ট ও উপজীব্য সঙ্গীতধারা প্রকৃতির মত স্বতোৎসারিতভাবে মাটির ঘ্রাণে, জলের তরঙ্গে, বাতাসের হিল্লোলে, মনের আনন্দ বেদনায় গড়ে উঠেছে মাঠে - ঘাটে - বাটে। আর তা লোকগীতি আউল - বাউল - সুফি ইত্যাদি নানা কিছু নিয়ে প্রাকৃত জনের সুর লহরী সারা দেশের অন্তর ছুঁয়ে প্রবাহিত।
বাবা আলাউদ্দিন খাঁ জীবনের প্রারম্ভে লোক জীবনের বাউল, ভাটিয়ালী , ভাওয়াইয়ার প্রান্তরে পরিভ্রমণ করে বয়স দশ পেরোবার আগেই সুরের টানে ঘর ছেড়েছিলেন। এরপর কত শ্রম- সাধনা, কত অভিজ্ঞতা আর নানা গুরু সঙ্গ। এতো কিছুর পর একদিন ভারতের সঙ্গীত জগতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রে পরিণত হতে পারলেন। অবিশ্বাস্য কাহিনী মনে হয় তাঁর জীবন সাধনাকে।
সঙ্গীতে ত্রিপুরা রাজ্যের সুনাম সেই রাজন্য আমল থেকে। রাজন্য শাসিত আমলে রাজারা সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন বটে , অন্দরমহলে রাণী রাজকন্যা, দাসদাসী সকলেই যেন সুর তরঙ্গে আন্দোলিত হতেন। ত্রিপুরার অরণ্য - প্রান্তর, মাঠ- ঘাট সর্বত্রই সঙ্গীতের সুর মূর্ছনা আন্দোলিত হয়। এমনি একটা প্রেক্ষিতে আলাউদ্দিন ত্রিপুরার মাটিতে 6 সেপ্টেম্বর 1862 খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ত্রিপুরার ভূমিপুত্র তিনি। ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন, ত্রিপুরা এখনকার মত ছোট্ট রাজ্য নয়। সে সময় বর্তমান বাংলাদেশের শ্রীহট্ট, কুমিল্লা ইত্যাদি নিয়ে স্বাধীন ত্রিপুরা বলে খ্যাত ছিল। এই স্বাধীন ত্রিপুরার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান তিনি। তাঁর পিতা সবদার খাঁ, সাধু খাঁ নামে যাঁর পরিচিতি ছিল। আলাউদ্দিনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নাম ছিল আফতাবউদ্দিন খাঁ আলাউদ্দিনের জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সীমানায় পড়েছে। শৈশবে বাবা ও বড়ভাইয়ের কাছে তাঁর সঙ্গীত শিক্ষার শুরু। শৈশবের সেই মুুক্ত দিনগুলিতে গ্রামের মাঠ ঘাট, বিলের পার, নদীঘাট, সবুজ শ্যামল বনানীর পাশে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। আর তাঁর সমগ্র সত্তায় বাউল, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়ার সুর মত্ত আলোড়ন তুলত। সঙ্গীতের তাড়নায় স্বগৃহের সীমানায় ছটফট করত তাঁর বালক মন। পাখির মত ডানা মেলে সঙ্গীতের মহাগগনে উড়াল দিতে চাইত তাঁর মন। আর তাই একদিন আপনজন আপন পরিচিত দুনিয়া ছেড়ে অনির্দিষ্ট জগতে পাড়ি দিলেন। কারও মতে তখন তাঁর বয়স আট বছর, কারও মতে দশ। বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি প্রথম একটা যাত্রাদলে যোগ দিলেন। উনিশ শতকের যে সময়ে তিনি যেমন যাত্রাদলে যোগ দিলেন তা ছিল আদি অকৃত্রিম বাংলা যাত্রাপালা এবং বাঙালির সম্পদ। পরবর্তীকালের শান্তিগোপালের বিশ্ব খ্যাত বিবর্তিত পালার সঙ্গে এগুলোর রাতদিন তফাৎ। যাক এই অভিজ্ঞতা বাংলার ট্রাডিশনাল লোকগীতিতে তাঁকে সমৃদ্ধ করল। তবে সঙ্গীত মহাসমুদ্রের কলকল্লোলে উতলা আলাউদ্দিন যাত্রাপালার নিরালার ছোট নদীর কুলকুল ধ্বনিতে তৃপ্ত থাকতে পারেন কি করে?
  কিছুদিন পর তিনি কলকাতা চলে গেলেন। আলাউদ্দিনের জীবনের প্রথম চল্লিশটা বছর এক অদ্ভুত অতৃপ্তিসঞ্জাত রহস্যময়তা আর রোমাঞ্চতায় ঘিরে ছিল। সঙ্গীত সন্ধানী তাঁর উড়ুউড়ু মন তৃপ্তি পাচ্ছিল না। তাই ছুট্ কেবল ছুট্। কলকাতা এসে তিনি গোপাল কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ওরফে নুলো গোপালের শিষ্যত্ব নিলেন। গোপাল কৃষ্ণ পরম স্নেহে পনেরো বছরের আলাউদ্দিনকে শিষ্য রূপে গ্রহণ করলেন। তিনি ধ্রুপদ, ধামার ও খেয়ালে অত্যন্ত পরিশীলিত ও সুদক্ষ গুরু ছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল বারো বছরে আলাউদ্দিনকে শিক্ষা দিয়ে পাকাপোক্ত করে দেবেন। গোপাল কৃষ্ণ তবলা, পাখোয়াজ এবং কণ্ঠসঙ্গীতের প্রাথমিক মৌল শিক্ষা দিলেন। যন্ত্রসঙ্গীত শিক্ষার প্রতি আলাউদ্দিনের অত্যন্ত আগ্রহ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে গুরু গোপাল কৃষ্ণের মৃত্যু হল।
   গুরুর মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন কলকাতার বিখ্যাত স্টার থিয়েটারের সঙ্গীত পরিচালক অমৃত লাল দত্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। অমৃতলাল দত্ত ওরপে হাবু দত্ত স্বামী বিবেকানন্দের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। তিনি আলাউদ্দিনকে স্টার থিয়েটারের বাদকদলে নিযুক্ত করলেন। ব্যাণ্ড বাদক হিসেবে পাশাপাশি গুরুর কাছে সঙ্গীত শিক্ষা চলতে থাকে। এর পাশাপাশি গোয়া থেকে আগত ব্যান্ডমাস্টার মি.লোবোর নিকট পাশ্চাত্য ক্ল্যাসিকাল সঙ্গীতে বেহালা বাদনও শিখতে লাগলেন। কলকাতা থাকাকালে বাংলা মঞ্চের অর্কেষ্ট্রার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন।
    কয়েকবছর পরে বিশ বছর বয়সে মুক্তাগাছিয়ার (বর্তমান বাংলাদেশ) জমিদার জগৎ কিশোর আচার্যের বাড়িতে কনসার্টে সরোদবাদন শুনলেন। স্বনামধন্য ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁ ছিলেন সেই মহফিলের আশ্চর্য সরোদবাদক। এই অভিজ্ঞতা আলাউদ্দিনকে চমকে দিল, দিওয়ানা করে দিল। এর আগে আলাউদ্দিন আহমেদ আলি খাঁ সাহেবের সরোদবাদন শুনেননি। আহমেদ আলি খাঁর গুরু ছিলেন আসগর আলি খাঁ সাহেব। আসগর আলি খাঁ ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁয়ের পিতার ঠাকুর্দার ভাই। সে হিসেবে আমজাদ আলি খাঁয়ের ঠাকুর্দা।
   ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁয়ের সরোদবাদনে আত্মহারা আলাউদ্দিন বারবার তাঁর কাছে সরোদবাদন শিক্ষার জন্য অনুনয় বিনয় করতে লাগলেন। 
ওস্তাদ আহমেদ আলি খাঁ বাংলার দিনাজপুরের এক রাজদরবারের সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। পাঁচবছরে নিজের সবটুকু দিয়ে আলাউদ্দিন সরোদবাদন শিখলেন। পরবর্তীতে গুরুর সঙ্গে রামপুর যেতে হল এবং শিক্ষায় তাঁর একনিষ্ঠতায় একটুও চিড় ধরল না। শিষ্যের একাগ্রতা ও পারদর্শিতা দেখে গুরু বুঝলেন এবার তাঁর উপযুক্ত শিষ্যের ' গোঁড়া বন্ধন 'এর সময় হয়েছে। গোঁড়া বন্ধন মানে গুরু - শিষ্যের অবিচ্ছেদ্য ও আজীবন সম্পর্কের এক পবিত্র বন্ধন ক্রিয়া। আলাউদ্দিন রামপুর নবাব দরবারের সুবিখ্যাত ও সুদক্ষ বীণাবাদক ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁর বীণাবাদনের নৈপুণ্যের কথা শুনে বীণাবাদনের প্রতি আকৃষ্ট হন। ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁ ছিলেন কিংবদন্তী সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের সাক্ষাৎ শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন। শিষ্যের মনোভাব বুঝতে পেরে আহমেদ আলী খাঁ সাহেব আলাউদ্দিনকে ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের হাতে সঁপে দিলেন। আলাউদ্দিন খাঁ ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের সম্মতিক্রমে তাঁর সঙ্গীতজ্ঞ শিষ্যমণ্ডলীতে সামিল হলেন এবং ওয়াজির আলী খাঁয়ের কাছে তানসেনের নিজস্ব সঙ্গীত ঘরানা অর্থাৎ ' Tansen School Of Music ' সেনিয়া ঘরানায় বীণাবাদন শেখেন। ইতিমধ্যে আলাউদ্দিন রামপুর স্টেট ব্যাণ্ডে বেহালাবাদক হিসেবে যোগদান করেছিলেন। তিনি শাস্ত্রীয় ধ্রপদ, ধামার, হোরি এসবও শিখে নিলেন যাতে করে নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্র যেমন সুরশৃঙ্গার, সেরনিয়াবাত রবাবে এসবও বাজাতে পারেন। এসব বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা তিনি ওস্তাদ ওয়াজির আলী খাঁয়ের কাছেই পেয়েছিলেন। 
   ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব কিছুকাল পরে মধ্যপ্রদেশের মাইহার স্টেটের রাজসভার সঙ্গীতশিল্পী রূপে যোগদান করেন। মাইহার স্টেটের রাজা ব্রিজনাথ সিং পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে রাজসভার সকল সঙ্গীতজ্ঞদের পুরোভাগে স্থান দিলেন। তিনি হলেন রাজসভার সঙ্গীতশিল্পীদের গুরু। তখন থেকেই আলাউদ্দিন মাইহারের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন। এসময় তিনি ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, হোরি, টপ্পা, ঠুংরি এসব ক্ল্যাসিক্যাল কণ্ঠসঙ্গীতের শিক্ষাদান করছিলেন। কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি নানাপ্রকার যন্ত্রসঙ্গীতের শিক্ষাও দিয়ে যাচ্ছিলেন।এতদিনের শিক্ষার্থী এবার সুদক্ষ শিক্ষাগুরু। সেনিয়া ঘরানার বীণা, রবাব, সরোদ, সেতার, বেহালা, সুরবাহার এসব যন্ত্রসঙ্গীতের সুনিপুণ গুরু এখন তিনি। অসামান্য সঙ্গীত প্রতিভা তাঁকে অনন্যতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বিপুল খ্যাতি অর্জন. করলেন তিনি।
   রাজদরবারের সঙ্গীতগুরু হিসেবে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মাইহার ঘরানাকে  সম্পূর্ণরূপে গড়ে তুললেন। মাইহার ঘরানা প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকের সৃষ্ট সম্পদ। কিন্তু বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের নিরলস সাধনা ও প্রয়াসে তাঁর সমকালে এই ঘরানা বিপুল বৈভবে পরিপুষ্টির হয়ে বিকশিত হল, প্রতিষ্ঠা পেল। তাঁর অবদান এতোখানি মৌলিক ছিল যে জন্য অনেক সময় তাঁকে এই ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তখন এমন একটা দ্রুতগতির বিবর্তনের কাল চলছিল ধ্রুপদী যন্ত্রসঙ্গীতের জগতে। খাঁ সাহেব একাধারে একনিষ্ঠ বীণাবাদক ও ধ্রুপদাঙ্গের শিল্পী ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি বীণা, সুরবাহার ( bass sitar) ও সুরশৃঙ্গার ( bass sarod) এসবকে অনেক ক্লাসিক্যাল যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পেরেছেন। তাঁর এই কৃতিত্ব চিরস্মরণীয়। 
    1926 খ্রিস্টাব্দে নিজের বাসভবন ' মদিনা ভবন '-এ আলাউদ্দিন দরিদ্র সহায়সম্বলহীন সঙ্গীতপ্রেমী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কালক্রমে এই শিক্ষাকেন্দ্র তাঁর বাসভবনকেই একটি সঙ্গীত শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরিত করল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে সুসজ্জিত এক অভিনব অর্কেষ্ট্রা গড়ে তুললেন। এই অর্কেষ্ট্রা পরবর্তী সময়ে ' মাইহার ব্যাণ্ড ' বা ' মাইহার বাদ্যবৃন্দ ' নামে পরিচিতি লাভ করল।
   সঙ্গীতের জন্য আলাউদ্দিন বাল্যকালে স্বজন ও স্বগৃহ ত্যাগ করে পরিব্রাজকের মত সঙ্গীত তীর্থে তীর্থে দিওয়ানা হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন।  প্রতিভা, একনিষ্ঠতা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ে দুহাত ভরে কুড়িয়েছেন সঙ্গীতের মণিরত্নাদি। তাঁর চরিত্রের মহৎ গুণ ছিল নিরভমানিতা। কিন্তু সঙ্গীতনিষ্ঠা তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল। তাঁর অন্নদাতা মাইহাররাজ ব্রিজনাথ সিং যখন তাঁর শিষ্য, সে সময় রাজার হাতুড়ি দিয়ে তবলায় সুর বাঁধার সময় রাজার সামান্য ত্রুটির জন্য রাজার দিকে হাতুড়ি ছুঁড়ে মারেন। অমায়িক সহজ সরল হলেও আলাউদ্দিন সঙ্গীত শিক্ষায় শিষ্যের সামান্যতম অবহেলা মানতে পারতেন না। এমনি ছিল তাঁর সঙ্গীত প্রেম! 
   আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সমগ্র সঙ্গীত জীবনের সঙ্গে তিনটি মৌলনীতি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থেকে তাঁকে পরিচালিত করেছিল,নিয়ন্ত্রিত করেছিল। আর এই তিনটি নীতি হচ্ছে — ১) প্রকৃত সঙ্গীত জ্ঞান অর্জনের জন্য আত্মার সীমাহীন অন্বেষণ, ২) লব্ধ জ্ঞানের বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সর্বোচ্চ স্তরে উন্নয়নের জন্য নিয়ত পরিচর্যা করা এবং ৩) তিনি যেসব শিষ্য বা শাগরিদদের উপযুক্ত মনে করবেন তাঁদের বিস্তৃত পরিসরে নিবিড় তালিম দেওয়া। সারাটা জীবন এই নীতিমালাকে তিনি সত্য মেনেছেন এবং পালন করেছেন। বংশ পরম্পরায় তিনি সঙ্গীতবিদ্যার উত্তরাধিকার পাননি, অধ্যবসায়, শ্রম ও নিষ্ঠা দ্বারা তা অর্জন করেছেন। তাঁর জীবনই তাঁর অর্জিত শিল্পের বিষয়ে প্রামাণ্য সত্য, আর বিশ্বস্ত ও আন্তরিক সীমাহীন পরীক্ষা - নিরীক্ষার প্রামাণ্য ক্ষেত্রও বটে । তাঁর সঙ্গীত সাধনার ক্ষেত্র আজীবন ব্যাপ্ত। আর সঙ্গীত সাধনায় পরীক্ষা -নিরীক্ষা ছিল তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। নিয়ত সঙ্গীত নিয়ে এমনিতরো পরীক্ষা - নিরীক্ষা তাঁকে সঙ্গীতের সত্তার সান্নিধ্যে নিয়ে গেছে, নব নব সৃষ্টির আলোকোজ্জ্বল জগতে তাঁকে উত্তীর্ণ করেছে। সম্ভবত নিজ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর মনে সংকীর্ণ ও নিম্নমানের শিক্ষাদানের প্রতি বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল। সেজন্যই নিজে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষাগুরুর বিমূর্ত প্রতীক হতে পেরেছেন। আর এখানেই তিনি অসামান্য। 
    বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের শিষ্যমণ্ডলীতে তাই বিশ্ববন্দিত শিল্পীরাই ছিলেন। তাঁর পুত্র ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী ( রোশনারা খানম্), পণ্ডিত তিমির বরণ, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, মাইহারের মহারাজা ব্রিজনাথ সিং, পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ, পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জি, শরণরাণী, পণ্ডিত যতীন ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য, আলাউদ্দিনের ভ্রাতুষ্পুত্র ওস্তাদ বাহাদুর খান। আরও ছিলেন আলাউদ্দিনের নাতি - নাতনীরা —আশিস খান, শুভো শঙ্কর ( পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও অন্নপূর্ণা দেবীর পুত্র), ধ্যানেশ খান, আমিনা পেরেরা, প্রাণেশ খান এবং অমরেশ খান।
    নীতিগতভাবেই আলাউদ্দিন সঙ্গীতগুরু হিসেবে কোনদিনই শিষ্যদের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা কোন উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেননি। বরং শিক্ষাদানকালে শিষ্যদের সমস্ত ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব নিজে বহন করেছেন। এই বিষয়টা প্রাচীন ভারতের গুরুকুল প্রথাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আরো মনে হয় বাবা আলাউদ্দিন সঙ্গীত শিক্ষার জন্য সারাটি জীবন যে সংগ্রাম করে গেছেন, সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতাতেই যেন সঙ্গীত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য স্নেহময় হাতে ছত্রছায়া ধারণ করে থেকেছেন।
    সরোদে কনসার্ট বাদন করলেও আলাউদ্দিন দক্ষতা সহ নানাপ্রকার বাদ্যযন্ত্র বাজাতে সক্ষম ছিলেন। তাঁর মধ্যে যে মহান ক্ষমতা ছিল তার বলে অর্জিত বিদ্যাকে অবলীলাক্রমে অধ্যাপনার কাজে ব্যবহার করতে পেরেছেন। বাদ্যযন্ত্র ও তারযন্ত্রের যে জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন তা সাবলীলভাবে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পরিশীলিতভাবে তুলে দিতে পেরেছিলেন। 
    আলাউদ্দিন পুত্র আলী আকবর খানকে সরোদ শিক্ষা দেন, কন্যা অন্নপূর্ণা দেবী তাঁর কাছে সুরবাহার শেখেন। শিষ্য রবিশঙ্কর ও নিখিল ব্যানার্জি সেতার বাদন শেখেন, যতীন ভট্টাচার্য ছিলেন সরোদ বাদক, রবিন ঘোষ বেহালা বাদক, ব্রিজনাথ সিং ও পান্নলাল ঘোষ বাজাতেন বাঁশের বাঁশি। পুত্রকন্যা ও শিষ্যমণ্ডলী নিয়ে এভাবেই গড়ে ওঠে তাঁর মাইহার ব্যাণ্ড। তাঁর সযত্নে লালিত পালিত ও পূর্ণাবয়বে সুগঠিত মাইহার ঘরানার দুই শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্কর ( জামাতা) ও পুত্র আলি আকবর খান স্বদেশ সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারের খ্যাতিমান দুই মহাজ্যোতিষ্ক। ভারতাত্মার মর্মবাণী শিল্গৈশ্বর্য এই দুই বিরল প্রতিভাধর শিল্পী উন্মুখ বিশ্ববাসীর সামনে উজাড় করে তুলে দিয়েছেন। স্বদেশ -বিদেশে তাঁদের শিল্প ঘরানার প্রতি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তালিমের ব্যবস্থা করেছেন। সারা পৃথিবীর শিল্প বোদ্ধা ও রসিক সমাজ আজো কৌতূহলী ও বিস্মিত এই সঙ্গীত ঘরানা সম্পর্কে।
    উল্লেখ্য বিশ্ব দরবারে ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পের বিশেষ করে যন্ত্রশিল্পের উপস্থাপনার কাজটি কিন্তু বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব করে গেছেন। 1935- 36সাল নাগাদ ভারতের কিংবদন্তী নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের নৃত্যদলে যোগ দিয়ে আলাউদ্দিন আন্তর্জাতিক সফরে বের হন। নিঃসন্দেহে উদয়শঙ্করের ব্যালে ট্রুপের কেন্দ্রীয়  আকর্ষণ ছিলেন আলাউদ্দিন। অন্যভাবে বলা যায় বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের শিল্পসম্ভারের প্রথম বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন হল এভাবে। পরবর্তীকালে উদয়শঙ্করের সঙ্গে আলমোড়ায় তাঁর ' ইণ্ডিয়া কালচারাল সেন্টারে 'আলাউদ্দিনের সক্রিয় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে হিমালয়ের উত্তরাখণ্ডের সিমলাতে, আলমোড়া থেকে তিন মাইলা দূরে ছিল সেন্টারটি। সেখানে কথাকলি শেখাতেন শঙ্করণ নাম্বুদ্রি, ভারতনাট্যম কননপ্পা পিল্লাই, মণিপুরী নৃত্য শেখাতেন আম্বি সিংহ। আর এসব রথী মহারথীদের সঙ্গে সঙ্গীত শিক্ষাদানে ছিলেন বাবা আলাউদ্দিন। এই কেন্দ্রে প্রথিতযশা বিপুল সংখ্যক নৃত্য ও সঙ্গীত শিক্ষার্থীর সমাবেশ ঘটে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গুরু দত্ত., শান্তি বর্ধন, সিমকি, অমলা, সত্যবতী, রমেন্দ্র শর্মা, রুমা গুহঠাকুরতা, জোহরা সেহগাল, প্রভাত গাঙ্গুলি,আজরা, লক্ষ্মীশঙ্কর, শান্তা গান্ধী প্রমুখেরা। এছাড়া রবিশঙ্কর আর উদয়শঙ্করের ভাই রাজেন্দ্র ও দেবেন্দ্র শিক্ষার্থী হিসেবে ছিলেন। কিন্তু চার বছর পরে অর্থাভাবে এমন একটি কেন্দ্র বন্ধ হলে ভারতের নৃত্য ও সঙ্গীত জগতের বিপুল ক্ষতি হল বলা যায়। 
    আনুমানিক 1888 সালে আলাউদ্দিন মদন মঞ্জরীকে বিবাহ করেন। তাঁদের জ্যেষ্ঠ পুত্র আলি আকবর খান, তিন কন্যা শারিজা, জাহানারা ও রোশেনারা।অল্পবয়সে শারিজার মৃত্যু হয়। জাহানারার বিবাহিত জীবনে তাঁর পরিবার সঙ্গীত চর্চায় বাধাপ্রদান করে। দুঃখিত আলাউদ্দিন রোশেনারাকে সঙ্গীতের তালিম না দেবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু  একদিন ঘরে ফিরে দেখলেন পুত্র আলী আকবর রোশেনারাকে অত্যন্ত নিপুনতায় কোন কিছু শেখাচ্ছেন। কন্যার সঙ্গীত প্রতিভা ও নৈপুন্য দেখে হতভম্ব আলাউদ্দিন পূর্ব সিদ্ধান্ত বাতিল করলেন। এরপর অত্যন্ত যত্ন নিয়েই তিনি কন্যাকে কণ্ঠসঙ্গীতের পাশাপাশি সেতার, সুরবাহারের তালিম দেন। পরবর্তীকালে রোশেনারার বিবাহ হয় আলাউদ্দিনের আরেক প্রতিভাশালী কিংবদন্তী তুল্য শিষ্য বিশ্বখ্যাত সেতার শিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করের সাথে। জন্মের পর মাইহার রাজ ব্রিজকুমার সিং রোশেনারার নাম দেন অন্নপূর্ণা, রবিশঙ্করের সাথে বিয়ের পর তিনি অন্নপূর্ণা নামেই পরিচিতি লাভ করেন। আলাউদ্দিনের এই কন্যা ও শিষ্যা ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত জগতে অনন্যসাধারণ প্রতিভা প্রদর্শন করেন। আর সুরবাহার বাদনে তাঁর কৃতিত্ব সর্বজনমান্য। কিন্তু রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তিনি বোম্বেতে বাস করতে শুরু করেন। এরপর কোনও পাবলিক অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। শুধু সঙ্গীত শিক্ষা প্রদান করেন। বংশীবাদক হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, নিখিল ব্যানার্জির মত শিষ্যকে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছেন।
    আলাউদ্দিন দেশের রবিতীর্থ শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একবার সাক্ষাৎকারে যান। অল্প বয়সের ছোট বড় এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার অবশ্যই স্মরণীয় ঘটনা। শান্তিনিকেতনে ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ সেখানকার প্রথিতযশা ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে সঙ্গীতে নিবেদিতপ্রাণ এই মহান সঙ্গীতশিল্পীর একটি প্রতিমূর্তি নির্মাণের কথা বলেন। রামকিঙ্কর বেইজ আরেক মূর্তিমান প্রতিভা। নিউদিল্লিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে স্থাপিত তাঁর নির্মিত ' যক্ষিণী ' মূর্তিটি যেন সাক্ষ্য দেয় রামকিঙ্করের প্রতিভা কতখানি ও ঠিকানা কোথায়। আর শান্তিনিকেতনে তো তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অজস্র। 
    জন্মগ্রাম থেকে একদা সঙ্গীতের যে তৃষ্ণায় আলাউদ্দিন দৌড় শুরু করেন সে দৌড় সমগ্র জীবন ব্যাপী ছিল। একসময় দৌড়টা থামল মাইহারে। থামল বলা যায় কিভাবে? এরপর তো মাজাঘষা, অণ্বেষণ, বিতরণ। সঙ্গীত জগতে নবতর সৃষ্টির আরেক দৌড়। রাগ রাগিণীর বিশাল জগতে বিচরণ করে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা তাঁকে পেয়ে বসল। প্রতিভার সুউচ্চ মিনারে অধিষ্ঠিত থেকে একের পর এক রাগ সৃষ্টি করতে লাগলেন তিনি। রাগ মদনমঞ্জরী ( পত্নীর নামে), প্রভাকলি, ভগবতী, হেমন্ত, সরস্বতী, শোভাবতী, মাধবিশ্রী, হেমভৈরব, মাধবগিরি, হেমবেহাগ, মাঞ্জ খাম্বাজ এসব তাঁর সৃষ্টি। তাঁর সৃষ্ট ' মাইহার ব্যাণ্ড ' বা ' মাইহার বাদ্যবৃন্দ ' ভারতের প্রথম অর্কেষ্ট্রা। সুর সম্পর্কিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন বলে সুরের চলাচলের পরিসর বা রেঞ্জ সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাই সরোদ, সেতার, সুরবাহার, সুরশৃঙ্গার, সেনিয়া রবাব,  চন্দ্র সারঙ, সেতার, ব্যাঞ্জো, নলতরঙ্গ যন্ত্র সঙ্গীতের এসব তারযন্ত্র বা অন্যান্য যন্ত্রের শব্দগুণকে সমুন্নত পরিসরে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারতেন। 
    1955 সালে আলাউদ্দিন ' মাইহার কলেজ অফ মিউজিক ' স্থাপন করে জীবনের যাত্রাপথে আরেকটি মাইল স্টোন প্রতিষ্ঠা করেন। 1959 সালে তিনি কলকাতায় সর্বশেষ জনসমক্ষে মঞ্চ পরিবেশনা করেন। 1961সাল থেকে কণ্ঠসঙ্গীত বা যন্ত্রসঙ্গীত সবকিছুর জনসমক্ষে মঞ্চপরিবেশনা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেন। এক সুদীর্ঘ আলোকোজ্জ্বল ব্যতিক্রমী সূষ্টির জীবন পশ্চাতে রেখে, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ অবশেষে থামলেন। তাঁর চলা চিরতরে 1972 সালের 6 সেপ্টেম্বর সমাপ্ত হল।
    ব্যক্তি হিসেবে আলাউদ্দিন একজন নিবেদিতপ্রাণ মুসলমান,সাথে সাথে মাইহারের মা সারদা ও শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত মহান শিল্পী। তাঁর বাসভবনে হিন্দুর দেবদেবীর চিত্র ও মূর্তি সুসজ্জিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি আগাপাশতলা ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মহান মানুষ ছিলেন।এই প্রমাণ মেলে ফিল্ম ডিভিশনের ডকুমেন্টারী ফিল্ম ' বাবা 'তে।
   বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সঙ্গীতের কিছু রেকর্ড করা হয়েছিল। সেসব রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডগুলি হচ্ছে ' অল ইণ্ডিয়া রেডিও ' কৃত রেকর্ডগুলি। 1960 -61 সালের মধ্যে এসব রেকর্ড করা হয়।বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের জীবদ্দশায়ই দেশের নানা সম্মানে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। 1952 সালে তিনি ' সঙ্গীত নাটক একাডেমি ' পুরস্কার পান। 1954 সালে ' সঙ্গীত নাটক একাডেমি ' তাঁকে সারা জীবনের অবদানের জন্য ' লাইফ টাইম ফেলোশিপ ' প্রদান করে। ভারত সরকার প্রদত্ত ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তৃতীয় উচ্চতম রাষ্ট্রীয় সম্মান ' পদ্মভূষণ '1958সালে এবং দ্বিতীয় উচ্চতম রাষ্ট্রীয় সম্মান ' 'পদ্মবিভূষণ ' 1971সালে দেওয়া হয়।
    এসব সম্মান প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। অবশ্য শিল্পী আলাউদ্দিন সম্ভবত আরো বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন আপামর ভারতবাসীর ভালবাসা পেয়ে।
                      
                                 

কাজরী,
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

    




    

বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলা





























ভাষার নাম বাংলা, দেশের নাম বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীন হবার পরপর বিরাট একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। সে ঘটনা বিশাল ব্যাপ্তি পেয়ে বাংলাদেশী বাঙালিদের কাছে এক মহত্তম প্রাপ্তি হয়ে উঠেছে। আর সে প্রাপ্তির নাম ' অমর একুশে গ্রন্থমেলা'। বাংলায়  এ মেলার প্রিয় পরিচিত নাম 'একুশে বইমেলা'। এখন ওদেশে এর চেয়ে বড় এবং গরিমার কোন মেলা নেই মনে হয়। এও মনে হয় সারাটা বছর ধরে এ মেলার প্রস্তুতি পর্ব ভেতর ভেতর চলতে থাকে। বললে অত্যুক্তি হবে না মনে হয়। একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চা বর্তমানে অনেকাংশেই পরিচালিত হচ্ছে। বই লেখা, বই প্রকাশ, কেনাকাটা ও পড়া এবং তার সাথে সংস্কৃতিচর্চা মিলেমিশে একাকার। ভালো লাগে বাঙালির এই উদ্যম ও উদ্যোগ।

    ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাভাষার জন্য আন্দোলনে যে আত্মোৎসর্গ হয়েছিল, তারই স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নামকরণ অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

         এই মেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলার ইতিহাসের মতোই মহান। জানা গেছে ১৯৭২ সালের ৮ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে বটতলায় চিত্তরঞ্জন সাহা এক টুকরো চটের উপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার সূচনা করেন।চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ, যার বর্তমান নাম মুক্তধারা। এখান থেকেই প্রকাশিত এই বত্রিশটি বই  বাংলাদেশী শরণার্থী লেখকগণ লিখেছিলেন। বইগুলি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান।  তিনি একাই ১৯৭২সাল থেকে এই বইমেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে ১৯৭৬ সাল থেকে অন্যান্যরা অণুপ্রাণিত হয়ে যোগদান করেন।

     ১৯৭৮ সালে তখনকার বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বইমেলাকে সরাসরি বাংলা একাডেমীর সঙ্গে মিলিয়ে নিলেন। পরের বছর চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত 'বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি' নামক সংস্থাটিও মেলার সাথে যুক্ত হয়। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কাজী মওলা মনজুরে ১৯৮৩ সালে  বাংলা একাডেমিতে প্রথম "অমর একুশে গ্রন্থমেলা"র আয়োজন করেন।কিন্তু  এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। মর্মান্তিক বেদনাবহ এই ঘটনার জেরে সে বছর আর বইমেলা হলো না। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। কালানুক্রমে এই বইমেলা বাংলার প্রাণের মেলাতে পরিণত হয়েছে। বাংলা একাডেমী চত্বরে স্থানাভাব হওয়ায় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বইমেলা সুহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়েছে।  এ বছর ২৯৯টি অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের মধ্যে ২৩২জনকে সুহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে স্টল বরাদ্দ করা হয়।  ২০০২ খ্রিস্টাব্দে মেলায় ২৪০জন এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে সর্বোচ্চ ৪২৫ জন প্রকাশক অংশগ্রহণ করেছিলেন।

      বেশ কিছুকাল পয়লা ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি অব্দি বইমেলা চলতো। বর্তমানে ক্রেতা - বিক্রেতা, প্রকাশক, দর্শক সর্বশ্রেণীর মানুষের চাহিদা ও আবেদনে প্রতি বছর সারাটা ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে এই বইমেলা চলে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মেলার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার সব দায়িত্ব পালন করেন। স্টলগুলিকে প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্ণার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,  লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকায় বিভাজন করে স্থান দেয়া হয়। এছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষা শহীদ সালাম,রফিক, জব্বার , বরকত, শফিউর,ররীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম,ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড.  আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ  প্রমুখ উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের নামে বিভাগ করা হয়।

বইমেলা প্রাঙ্গনকে ভাষা-শহীদ,বরেণ্য লেখক,সাহিত্যিক,কবি ও বুদ্ধিজীবীদের নামে নয়টি চত্বরে বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন-ভাষা শহীদ চত্বর,রবীন্দ্র চত্বর,ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চত্বর,নজরুল চত্বর,সাহিত্য বিশারদ চত্বর, সুফিয়া কামাল চত্বর, ধীরেন্দ্রনাথ চত্বর, সোমেন চন্দ চত্বর ও রোকেয়া চত্বর প্রভৃতি। এছাড়া শিশু কর্ণারে রয়েছে শিশু বিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। প্রতিবারের মতো এবারও নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থা রয়েছে নজরুল মঞ্চে।

এই মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও বহির্দেশীয় ভারত, রাশিয়া, জাপান  এসব দেশ থেকেও নানা প্রকাশনা সংস্থা তাঁদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই মেলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, যেমন: বাংলাদেশ পর্যটন দপ্তর, বাংলদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর  তাঁদের স্টল নিয়ে মেলায় যোগ দেন । এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়। ইদানিং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকাশনা যেমন সিডি, ডিভিডি ইত্যাদিও স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও তাদের সেবার বিবরণসহ উপস্থিত হয়। বেশ জনপ্রিয়তার সাথে স্থান করে নিয়েছে নানাপ্রকার লিটল ম্যাগাজিন। মেলার মিডিয়া সেন্টারে থাকে ইন্টারনেট ও ফ্যাক্স ব্যবহারের সুবিধা। এছাড়া থাকে লেখক কর্ণার এবং তথ্যকেন্দ্র। মেলা প্রাঙ্গণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। মেলায় বইয়ের বিক্রয়ে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় থাকে। এছাড়া মেলায় শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ ও তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স রাখা হয়, যাঁরা  বইয়ের কপিরাইট বা মেধাসত্ত্ব আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে  কি-না শনাক্ত করেন ও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেন। মেলায় প্রবেশের জন্য ছুটির দিন ও ছুটির দিন বাদে অন্যান্য দিন আলাদা প্রবেশ সময় থাকে। মেলায় প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ ফি ধার্য করা হয় না।

   মেলা চলাকালীন প্রতিদিনই মেলাতে বিভিন্ন আলোচনা সভা,কবিতা  পাঠের আসর বসে; প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সাথে মত বিনিময় করেন। এছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়ক উন্মোচিত বইগুলোর নাম, সেগুলির  লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় ও দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রেডিও ও টিভি চ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পনসর হয়ে মেলার তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক-শ্রোতাদেরকে অবহিত করে। এছাড়াও মেলার প্রবেশদ্বারের পাশেই স্টল স্থাপন করে বিভিন্ন রক্ত সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান সেবামূলক কাজ করে।

  চিত্তরঞ্জন সাহার নামে  একটি পদক প্রবর্তন করা হয় ২০১০ সালে । আগের বছরে প্রকাশিত বইয়ের গুণমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে এই পুরস্কার দেয়া হয়।পুরস্কারটির নাম 'চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার '। স্টলের সজ্জা -শৃঙ্খলার জন্য দেওয়া হয়, 'সরদার জয়েনউদদিন স্মৃতি  পুরস্কার '।   গ্রন্থ ক্রয়ের জন্য সেরা ক্রেতাকে দেয়া হয় 'পলান সরকার পুরস্কার'। তাছাড়া বইমেলার প্রবর্তক চিত্তরঞ্জন সাহার স্মৃতি রক্ষার্থে বাংলা একাডেমী ২০১০ সালে যে পুরস্কার প্রবর্তন করে তার ধারাবাহিকতায় এবারের বইমেলায় অংশগ্রহনকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং বইমেলায় সর্বাধিক সংখ্যক মানসম্মত বই প্রকাশের জন্য শ্রেষ্ঠ তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মেলায় কোন কোন প্রকাশনা সংস্থার স্টল স্থান পাবে, কেমন স্টল করতে পারবে, তার জন্য বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধানে আলাদা কমিটি গঠিত হয়। ২০১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। প্রকাশিত বইয়ের কপি জাতীয় আর্কাইভ  ও জাতীয় গণগ্রন্থাগারে  জমা দেওয়া হয়েছে কিনা, কর-নির্দেশক-নম্বর (TIN) ঠিক আছে কিনা যাচাই করার পাশাপাশি প্রকাশিত নতুন বইয়ের কপি বাংলা একাডেমীর তথ্যকেন্দ্রে জমা দেওয়ার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা হয়।
 
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে চলে অমর একুশে বইমেলা। প্রতি বছরই মেলার পরিসর এবং বিক্রি বাড়ছে। মূলত লেখক-পাঠক এবং প্রকাশকের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে এই মেলা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বাংলা একাডেমি চত্বরেই এতদিন এই মেলার আয়োজন হত। তবে এবার মেলার পরিসর বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে একাডেমি ভবনের উল্টো দিকে সুহরাওয়ার্দী উদ্যানে। মেলার আমেজ টের পাওয়া যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসির মোড় থেকেই। রাস্তার দুপাশের ফুটপাথজুড়েই নানারকম পণ্যের পসরা। বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়, এমন জিনিসও আছে। ছোট ছোট স্টলে বিক্রি হচ্ছে কবিতার ক্যাসেটও।

শুরু হওয়ার পর থেকে অমর একুশে বইমেলা আপামর বাঙালীর কাছে প্রাণজোয়ার সৃষ্টিকারী এক মেলায় পরিনত হয়েছে। বাঙালী লেখক, প্রকাশক এবং পাঠকদের কাছে বইমেলা এক মিলনমেলা। বইমেলায় জড়ো হতে থাকে দূর-দূরান্তের চেনা মুখগুলি। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারী পার হলে ভাঙে এ মিলন মেলা। বইমেলা মানুষের অন্তরে যে অমিয় বন্ধন তৈরি করে তা ভাঙে না কখনই। দেশের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। অনুপ্রেরনা জোগায়। বাঙালী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আবার কবে ফিরে আসবে আনন্দ সাগরের জোয়ার নিয়ে!

অমর একুশে বইমেলা বাঙালীর প্রাণের মেলা। বাঙালির সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ. মনন ও মানসিকতার বিকাশ এ মেলাকে কেন্দ্র করে স্বাধীন বাংলাদেশে বিকসিত হচ্ছে । ভাষা, সংস্কৃতিবোধ ও ঐতিহ্য হলো অমর একুশে বই মেলার ভিত্তি। লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের কাছে অমর একুশে বইমেলা এক মহান উৎসব। সবারই মিলন মেলা বাংলা একাডেমীর বই মেলা প্রকৃত অর্থে নিখিল বাঙালির মিলনমেলা। অমর একুশে বইমেলার প্রতীক্ষায় বাঙালী পাঠক, লেখক প্রকাশক কী উদ্গ্রীব হয়ে না থাকেন।

ভাষা আন্দোলন, বাংলা একাডেমী আর একুশের বইমেলা একই সূত্রে গাঁথা। একুশের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সম্পদ বাংলা একাডেমী। একুশে বইমেলা বিকশিত হয়েছে বাংলা একাডেমীকে কেন্দ্র করে। নবগঠিত বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক সাহিত্যিক জাগরণের পথপ্রদর্শক একুশের বইমেলা।

      ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমীর বইমেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। সে বছরই বাংলা একাডেমীর সাথে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি যৌথভাবে বইমেলার আয়োজন করে। ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমী কর্তৃক গ্রন্থমেলার জন্য বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রনয়ণ করা হয়। একই সাথে এই বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে বইমেলা’। তখন থেকে গৌরবের সাথে প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলা আয়োজিত হয়ে আসছে। গুটি কয়েক বই নিয়ে যে মেলা শুরু হয়েছিল তা আজ বাঙালীর প্রাণের মেলা। অমর একুশে বইমেলা এখন বাঙালির  ঐতিহ্যের এক প্রদীপ্ত মশাল।

আশির দশকে মেলার পরিধি, চিত্র এবং আয়োজনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেতে থাকে দ্রুত,বাড়তে থাকে অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা।১৯৮০ সালে বইমেলায় অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩০। ১৯৮৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ তে এবং ১৯৯১ সালে এ সংখ্যাটি ১৯০ তে উন্নীত হয়। বইপ্রেমীদের জোয়ারে বাঁধ ভেঙে যায় সকল প্রতিবন্ধকতার ১৯৯২ সালে অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহন করে মোট ২৭০ টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠান ও বইপ্রেমীদের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বইমেলার পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়। বাংলা একাডেমীর দেয়াল ভেঙে বৃদ্ধি করা হয় এ মেলার স্থান। জনগণের প্রবেশদ্বার হয় প্রসারিত। সুহরাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন দু পাশের রাস্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলন চত্বর থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে অমর একুশে বইমেলার পরিধি। স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গনে বইমেলার আয়োজন শুরু হলেও তা পূর্ণতা পায় মূলত নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৩ সালে অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৩৮। ১৯৯৪ সালে ছিল ৬৫৩,১৯৯৫সালে ছিল ৪৬৭, ১৯৯৬ সালে ছিল ৪৮৬, ১৯৯৭ সালে ছিল ৫২০ টি। ২০০৬ সালে ৩১৭,২০০৮ সালে ২৩৬,২০০৯ সালে ৩২৬। ২০১০ সালে অংশগ্রহনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫০৫টি। ২০১১ সালে ’অমর একুশে বই মেলায়’ অংশগ্রহন করছে ৩৭৬টি প্রতিষ্ঠানের ৫৫৬টি স্টল। এর মধ্যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সরকারী-বেসরকারী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, সেবমূলক ও গণমাধ্যম রয়েছে। এছাড়া ৩০টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য রয়েছে লিটল ম্যাগ কর্ণার। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাঁরা বই প্রকাশ করছেন তাঁদের বই বিক্রির জন্য জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমী প্রকাশিত বই একাডেমী প্রচলিত কমিশনে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বই ২৫ ভাগ কমিশনে বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ বছর অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গনকে ভাষা-শহীদ,বরেণ্য লেখক,সাহিত্যিক,কবি ও বুদ্ধিজীবীদের নামে নয়টি চত্বরে বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন-ভাষা শহীদ চত্বর,রবীন্দ্র চত্বর,ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চত্বর,নজরুল চত্বর,সাহিত্য বিশারদ চত্বর, সুফিয়া কামাল চত্বর, ধীরেন্দ্রনাথ চত্বর, সোমেন চন্দ চত্বর ও রোকেয়া চত্বর প্রভৃতি। এছাড়া শিশুকর্ণারে রয়েছে শিশু বিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। অমর একুশে বইমেলা ২০১১ প্রচার কার্যক্রমের জন্য তথ্যকেন্দ্র ছিল বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে। মিডিয়া কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয় তথ্য কেন্দ্রের উত্তর পাশে। তাৎক্ষনিকভাবে মেলা সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের জন্য ফ্যাক্সসহ ই-মেইলের ব্যবস্থা করা হয় মিডিয়া সেন্টারে। মেলায় প্রবেশের জন্য পুষ্টি ভবনের সামনে এবং আণবিক শক্তি কমিশনের সামনের প্রবেশ পথ ছিল। পহেলা ফেব্রুয়ারী থেকে ২৭ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টায় সেমিনারের ব্যবস্থা ছিল গ্রন্থমেলার মুক্তমঞ্চে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী পালনের অংশ হিসেবে এ বছর সেমিনারে রবীন্দ্রনাথের জীবন, সাহিত্য, নাটক প্রভৃতি নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এছাড়া প্রতিসন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা।বলা যায় সে বছরের মত এমন জমজমাট আয়োজন কমই দেখা গেছে।

 বর্তমান বছরের বইমেলা আসছে।সর্বত্রই পুরোদমে তোড়জোড় চলছে।এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে এই মেলার বার্তা : “বইমেলা এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এখানে এখন মানুষ বই কিনতে আসে, বই নাড়া-চাড়া করতে আসে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে বইমেলা এখন মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে”।

© সুনীতি দেবনাথ
কাজরী,
৯ জানুয়ারি, ২০১৭

[ Photo collected  from internet]
© সুনীতি দেবনাথ



চলতি বছরে ভারতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  পাচ্ছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। কবি শঙ্খ ঘোষ ভারতীয় সাহিত্যের উজ্জ্বল একটি মুখ। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্তিতে সারা বাংলা আনন্দিত ও গর্বিত। ১৯৬১সাল থেকে ভারতীয় সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য এই পুরস্কার প্রদান চালু হয়। ১৯৮২সালের আগে অব্দি নির্দিষ্ট বইয়ের জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কার দেওয়া হতো। কিন্তু এরপর থেকে সাহিত্যে সারা জীবনের অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ' গণদেবতা ' উপন্যাসের জন্য প্রথম বাঙালি সাহিত্যিক হিসেবে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে কবি বিষ্ণু দে, ১৯৭৬ সালে আশাপূর্ণা দেবী, ১৯৯১ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং ১৯৯৬ সালে মহাশ্বেতা দেবী এই পুরস্কার পান। শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে এই জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন মোট ছয়জন বাঙালি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সারা জীবন সাহিত্যকর্মের জন্য এই স্বীকৃতি পাচ্ছেন শঙ্খ ঘোষ । কুড়ি বছর পর কোনো বাঙালি ফের এই পুরস্কার পাচ্ছেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন।
  শঙ্খ ঘোষের জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুরে। কলকাতার যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের ওপর তিনি দীর্ঘদিন পড়িয়েছেন। রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবেও শঙ্খ ঘোষের পরিচিতি রয়েছে। ‘বাবরের প্রার্থনা’ বইয়ের জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান। ২০১১ সালে পান ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কার। এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন ‘দেশিকোত্তম’, ‘রবীন্দ্র’ পুরস্কারের মতো একাধিক পুরস্কার।
শঙ্খ ঘোষের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘ধুম লেগেছে হৃদকমলে’, ‘গন্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ ইত্যাদি। শঙ্খ ঘোষের এই জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্তিতে বাংলার শিল্প-সাহিত্য মহল আনন্দিত। কবি জয় গোস্বামী জানিয়েছেন, শঙ্খ ঘোষ দীর্ঘদিন ধরেই ভালো ভালো কবিতা লিখে আসছেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি উন্নত মানের প্রবন্ধও লেখেন। কবিকে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাচ্ছি।