লেখা-লেখি

রক্তশয্যা

৪:২৬:০০ PM 0 Comments




© সুনীতি দেবনাথ

ওরা তখনো এলোনা
শাল সেগুনের মাথা পেরিয়ে আকাশের ঐ কোণে
সান্ধ্যসূর্য মোলায়েম লাল মসলিনের ওড়না উড়িয়েছে ততক্ষণে।
চুপিচুপি চোখের ইঙ্গিতে জানা হয়ে যায়
ওরা আসছে অবশ্যই আসছে।
সারাটি উপত্যকা কোনো অশনিসংকেতে
থমথমে,  পথঘাট শুনশান,  দরজা জানালা চোখ বুজে, নিঃসাড় অরণ্যে দুঃসহ প্রতীক্ষা।
ওপাশে দেওনদীর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে আওয়াজ স্তিমিত চাপা।

প্রত্যাশিত সময়ের কিছু পরেই
তখনো আলোর বুকে ছায়া পুরো নামেনি
পায়ের আওয়াজ সাইরেন হয়ে বেজে উঠলো —
সারাটা উপত্যকা সহস্রাক্ষ যেন  হয়ে  গেল খুলে গেলো সব দরজা জানালা—
ওরা এসে গেছে— ওরা এসে গেছে,
দৃপ্ত পদে ওরা হেঁটে চলেছে উপত্যকার
সব পথে সব জনপদে নির্বাক মুখে
একটি স্লোগানও শোনা গেলোনা,
ওদের হাতে কোন আগ্নেয়াস্ত্রও ছিলোনা!

ছিলো শুধু
রক্ত রঙিন লালপতাকা গরিমায় পতপত,
মাথায় রেড ক্যাপ উজ্জ্বল,  এগিয়ে
 চলেছে ওরা
সিনা উঁচিয়ে— ওরা শান্তি সেনানী।
নির্বাক জনগণ ওদের চোখে দেখলো
নাফুরান সাহসের লকলকে আগুন
পশুর মত যারা নরমুণ্ড নিয়ে লোফালুফি খেলে
যারা গণতন্ত্রের নামে জুলুমের মুল্লুকে
রক্তের আলপনা আঁকে উঠোনে পথে
জনালয়ের অলিতে গলিতে কোনখানে নয়?
গণতন্ত্রের সবচেয়ে পবিত্র অধিকার
একদিনের রাজা হবার সুখ ভোটাধিকার
তাও কেড়ে নেবার ওস্তাদ ওরা।
সন্ত্রাস বিদীর্ণ উপত্যকাবাসী কাঁপছে,
মুক্তি পেতে চায় ওরা সন্ত্রাসী হানা থেকে ।

ওদের পদযাত্রা সারাটি উপত্যকায়
আশা- সাহসের ঝড়ো উদ্দামতা এনেছিলো
বদলে যাবে দমচাপা অন্ধ দিনলিপি
নতুন করে সবুজের হিল্লোল কাঁপবে তিরতির
অশোক শিমূলের লাল সাজ দেখে
দেও নদী হাসবে দিল খুলে খিলখিল।
এ বাড়ি ও বাড়ি এ পাড়া ও পাড়া
মিলেমিশে হয়ে যাবে একাকার।

সেদিন —
সেই নির্বাচনী দিনের আলো যখন শেষ প্রহরে, আধিকারিকগণ শেষ মুহূর্তের কর্তব্য সম্পাদনে তৎপর, শেষের সেই মুহূর্তে
পশুরা ক্ষিপ্ত তৃষ্ণায় চঞ্চল হয়ে তাকে ঘিরেছিল
চক্রব্যুহে অভিমন্যু এ যুগের,  আক্রান্ত অসহায়!
সে চিৎকারে ফালা ফালা করলো আকাশ
নির্বিকার সিকিউরিটি বাহিনী, জনগণ উদ্ভ্রান্ত আত্মরক্ষায় —
তার হাত পা ভেঙ্গে ফেলা হল, মাথার খুলি হলো চৌচির,
তাকে, সেই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
কমরেডকে রক্ত শয্যায় শুয়ে পড়তে হলো,
শেষ বিন্দু রক্তও ছিলো না যে ঝরাবার।
ব্যালট বক্স সুরক্ষিত রেখে, গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে
সুশীল প্রিসাইডিং অফিসার রক্ত মেখে গায়ে পালিয়ে গেলেন।
শুনশান চারপাশ, শুধু এক কালো কাক
উড়ে উড়ে কর্কশ কণ্ঠে বিদায় সঙ্গীত গাইলো :
            যুগ যুগ জিয়ো কমরেড!

কাজরী
১৬ জুলাই, ২০১৫

SUNITI Debnath

আমি সুনীতি দেবনাথ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষিকা। কবিতা, প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লিখি। কবিতা আমার প্রিয়ভূমি, শৈশব থেকেই হেঁটে চলেছি...

0 comments: